আফগানিস্তান-পাকিস্তান চলমান সীমান্ত-সংঘাত, ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্প্রীতি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে মনখোলা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আফগানিস্তানের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনাবিষয়ক উপমন্ত্রী মুহাজির ফারাই। বৈরী পরিবেশের সব কূটনৈতিক গুঞ্জন হাওয়ায় উড়িয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, ভারত কাবুলের আঞ্চলিক বস নয়। পাকিস্তানের সঙ্গেও শত্রুতা চায় না তালেবান সরকার। প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সঙ্গেই সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক চায় আফগানিস্তান।
হোয়াটসঅ্যাপে মুহাজির ফারাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আফগানিস্তানের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ই-মেইলের মাধ্যমে বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুগান্তরের আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান শামীম জোয়ার্দার।
যুগান্তর : বাংলাদেশ-আফগানিস্তান দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে আপনার মতামত কী?
ফারাই : বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আমাদের পক্ষ থেকে এবং আফগানিস্তানের জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মুসলিম জনগণকে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাচ্ছি। আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার স্বীকৃতির পাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করতে বিভিন্ন প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা সম্পর্ক গভীর করার জন্য কাজ করেছি। আশা করি, ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
যুগান্তর : প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা ৭২% কমেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কীভাবে এই নিরাপত্তা উন্নতি অর্জন করেছে এবং বর্তমানে নিরাপত্তার অবস্থা কেমন?
ফারাই : আলহামদুলিল্লাহ, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এমন কোনো বড় এলাকা নেই, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রাষ্ট্র কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সাত বা আট মাসে আমাদের কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেনি। দেশে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও সক্রিয় নেই।
আমি মনে করি না, যুক্তরাষ্ট্র আবারও আফগানিস্তান আক্রমণের মতো ভুল করবে। ২০ বছরের যুদ্ধ শেষে তারা পরাজিত হয়ে অপমানজনকভাবে সরে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও আক্রমণ করে, আমরা আগের মতোই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাব এবং জিহাদ করব।
যুগান্তর : আফগানিস্তানই একমাত্র দেশ যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। জনসমক্ষে কথা বলা, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ এবং কঠোর কর্মসংস্থান বিধিনিষেধের সম্মুখীন করা হয়েছে। এ আইনগুলো কি ইসলামি শরিয়াহর প্রকৃত ব্যাখ্যা নাকি তালেবানদের নিজস্ব ব্যাখ্যা?
- প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন ফারাই।
যুগান্তর : তালেবান সরকার শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আপনি কীভাবে নিশ্চিত করবেন যে শরিয়াহ আইন ন্যায়সংগতভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, স্থানীয় কমান্ডার বা কর্মকর্তারা এর অপব্যবহার করছেন না?
ফারাই : হ্যাঁ, ইসলামি আমিরাতের আইনগুলো শরিয়াহভিত্তিক। যা কুরআন, হাদিস ও হানাফি আইনশাস্ত্র থেকে এসেছে। দেশের সর্বত্র আমিরাতের আদালত রয়েছে, যেখানে যোগ্য ও প্রশিক্ষিত বিচারক ও মুফতিরা নিযুক্ত আছেন। কর্মকর্তাদের দ্বারা শরিয়াহর অপব্যবহার বা আদালতে হস্তক্ষেপের কোনো আশঙ্কা নেই। নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত সবাই আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এমনকি যদি কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন, তাকেও সাধারণ মানুষের মতোই আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
যুগান্তর : চলতি মাসেই পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে সংঘর্ষ ও বিমান হামলা হয়েছে। এই সংঘাতের মূল কারণ কী এবং কীভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব?
ফারাই : দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতি পাকিস্তানি সামরিক শাসন আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘন করে পাকতিয়া প্রদেশে হামলা চালায়। যার ফলে বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামিক আমিরাতের অবস্থান স্পষ্ট- আমরা কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি না এবং অন্যদেরও আমাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেব না। আমি মনে করি, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে সংঘাত চলছে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সংকটপূর্ণ। নিজেদের সমস্যাগুলো আড়াল করার জন্য তারা আফগানিস্তানের সঙ্গে জড়াচ্ছে, যা কারও জন্যই লাভজনক নয়। পাকিস্তানের উচিত তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিজেরাই সমাধান করা।
যুগান্তর : পাকিস্তানের অভিযোগ- তালেবান সরকার তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
ফারাই : টিটিপি পুরোপুরি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। টিটিপির উত্থান ইসলামিক আমিরাতের আবির্ভাবের আগে থেকেই। ২০০৭ সাল থেকেই তারা সক্রিয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। এর মূল কারণ হলো সেই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর দমননীতি। ইসলামিক আমিরাতকে দায়ী করা সঠিক নয়। ইসলামিক আমিরাত চার বছর ধরে ক্ষমতায়। আর টিটিপি প্রায় ১৭-১৮ বছর পাকিস্তানে সক্রিয়। টিটিপি সমস্যা ইসলামিক আমিরাতের কারণে নয়।
যুগান্তর : পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি কি সীমান্ত সংঘাত নিরসনে সহায়ক হবে?
ফারাই : নিশ্চয়ই। সম্পর্ক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এছাড়া তথ্য স্পষ্ট করতে পারে এবং পরস্পরের আকাশসীমা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়াতে পারে। আমরা আশা করি, দূতাবাসে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি যোগাযোগ ও আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
আমরা কখনো প্রতিবেশীদের ক্ষতি করতে চাই না। পানি ব্যবস্থাপনা আফগানিস্তানের অধিকার। সেটা পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর বা দক্ষিণ- যেখানেই হোক না কেন। কুনারে যদি বাঁধ তৈরি হয়, সেটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হতে পারে এবং আমরা পাকিস্তানকেও বিদ্যুৎ দিতে পারি। এটি ক্ষতিকর নয়, বরং এটি আমাদের ন্যায্য উন্নয়ন অধিকার।
যুগান্তর : আপনি কি বিশ্বাস করেন পাকিস্তান নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলবে? টিটিপি আক্রমণ বন্ধ করবে? কয়েক বছর আগেও তো তালেবান ও পাকিস্তান ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল- হঠাৎ এই বিচ্ছেদের কারণ কী?
ফারাই : আমরা আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান হবে। যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের প্রস্তাব পাকিস্তানই দিয়েছে। টিটিপি আক্রমণ বন্ধ করবে কি না, তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাদের নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। সম্পর্কের অবনতির কারণ হলো পাকিস্তানি সামরিক শাসন কিছু নীতি অনুসরণ করছে, যা জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন করে না। সেনাবাহিনীর একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চায়, যা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
যুগান্তর : আপনারা ‘ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে’ চলছেন বলে অভিযোগ তুলছে পাকিস্তান। বলছে, আফগানিস্তানের ভ‚মি ব্যবহার করে পাকিস্তানকে আক্রমণ করা হচ্ছে। আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারতের সফরের দিনই পাকিস্তানের প্রথম বিমান হামলা হয়। এ হামলার পেছনে কি আসলেই কোনো যোগসূত্র আছে?
ফারাই : এটি একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং পাকিস্তানের জনগণকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নতুন। এর আগে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। গত ২০ বছরে আফগান জনগণ প্রমাণ করেছে, ইসলামিক আমিরাত একটি স্বাধীন সরকার, যা ইসলামিক ও জাতীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিজের পথে চলে। পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে এমন প্রচারণা চালাচ্ছে। আমরা কারও নির্দেশে কাজ করি- এমন দাবি ভিত্তিহীন।
যুগান্তর : যুক্তরাষ্ট্র কি গোপনে পাকিস্তানকে আফগানিস্তানে হামলার জন্য উৎসাহিত করেছে?
ফারাই : এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বেশ কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বাগরাম ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের হুমকি এসেছিল কয়েকবার। যার পরই পাকিস্তান হামলা চালায়। তবে আমাদের কাছে দৃঢ় কোনো তথ্য নেই যে পাকিস্তানকে কেউ উসকে দিয়েছে। অন্য কারও স্বার্থে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা পাকিস্তানের উচিত নয়- এগুলো জটিল হিসাব।
যুগান্তর : বাগরাম ঘাঁটি নিয়ে কি আবারও হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র? পাকিস্তানের সাম্প্রতিক আক্রমণ কি মার্কিন প্রত্যাবর্তনের সূচনা হতে পারে?
ফারাই : আমি মনে করি না যুক্তরাষ্ট্র আবারও আফগানিস্তান আক্রমণের মতো ভুল করবে। ২০ বছরের যুদ্ধ শেষে তারা পরাজিত হয়ে অপমানজনকভাবে সরে গেছে। তাদের পক্ষে আবার ফিরে আসা যৌক্তিক নয়। যদি তারা ফিরেও আসে, তবে তা পাকিস্তানের মাধ্যমে আসবে না। কারণ, কোনো প্রমাণ নেই যে পাকিস্তান কারও নির্দেশে কাজ করেছে। আমরা আশা করি, এমনটি হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও আক্রমণ করে, আমরা আগের মতোই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাব এবং জিহাদ করব।
যুগান্তর : সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি দেখা গেছে। আপনি কি মনে করেন এটি তালেবান সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা?
ফারাই : পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তারা নিজেদের স্বার্থে সম্পর্ক রক্ষা করে। আমাদের এতে কোনো আপত্তি নেই। আফগানিস্তানও স্বাধীন দেশ। আমরা চাইলে যে কোনো দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখতে পারি। তবে যদি এসব সম্পর্ক আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা হয়, আমরা তা হতে দেব না- আফগানরা নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে সক্ষম।
যুগান্তর : প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিযোগ- আল-কায়দা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এখনো আফগানিস্তানে আশ্রয় পাচ্ছে। তালেবান সরকার কি এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে?
ফারাই : না, একেবারেই না। এসব দাবি ভিত্তিহীন। দোহা চুক্তিতে আমরা অঙ্গীকার করেছি- আফগান ভূমি অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না এবং আমরা সেই প্রতিশ্র“তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশে এমন কোনো গোষ্ঠীর উপস্থিতি নেই।
যুগান্তর : আইএস-খোরাসান (আইএসআইএস-কে) এখনো সক্রিয়। প্রতিবেদনগুলো বলছে, তাদের শক্তি দ্বিগুণ হয়েছে এবং তারা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরিকল্পনা করছে। তালেবান সরকার কীভাবে এটি মোকাবিলা করছে? তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা কতটা সম্ভব?
ফারাই : আলহামদুলিল্লাহ, নিরাপত্তা নিশ্চিত রয়েছে এবং এসব প্রতিবেদন সত্য নয়। সাত-আট মাসে কোনো বড় নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেনি। ইসলামি আমিরাত পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু প্রতিবেশী দেশ এ বিষয়টি অতিরঞ্জিত করে প্রচারণা চালাচ্ছে, এমনকি তাদের আশ্রয়ও দেয়। আফগানিস্তানের ভেতরে আইএসআইএস-কে পরাজিত হয়েছে। তাদের কোনো ঘাঁটি বা বিশাল অঞ্চল নেই। যদি কোনো বিচ্ছিন্ন উপাদান থেকে থাকে, তা আফগানিস্তানের বাইরে।
যুগান্তর : ২০২২ সালে তালেবান সরকার আফিম চাষ নিষিদ্ধ করে। এ কারণে উৎপাদন ৯৫% কমেছে। তবে দাম দশগুণ বেড়েছে এবং মজুত থাকা আফিম ২০২৭ সাল পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে পারবে। নিষেধাজ্ঞাটি কি কার্যকর ও টেকসই?
ফারাই : ইসলামিক আমিরাত শুধু পপি চাষই নয়, মাদক ব্যবসাও নিষিদ্ধ করেছে। আগে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ আসক্ত ছিল। তাদের অধিকাংশকে পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য বিশেষ আদালত ও শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। মাদক উৎপাদন ও বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ। এটি এমন একটি সাফল্য, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪৮টি দেশ অর্জন করতে পারেনি। যেখানে আফগানিস্তান একসময় বিশ্বের ৯০-৯৫% আফিম উৎপাদন করত, তা এখন আলহামদুলিল্লাহ শূন্যের কোঠায়।
যুগান্তর : আফিম ব্যবসা একসময় তালেবানদের বার্ষিক আয়ের ৬০% পর্যন্ত জোগাত। এখন সেই উৎস বন্ধ হলে সরকার কীভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করছে এবং অর্থনীতি চালাচ্ছে?
ফারাই : এ অভিযোগ আগেও করা হয়েছিল, তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে সবকিছুই অভ্যন্তরীণ রাজস্ব থেকে অর্থায়ন করা হয়। গত ২০ বছর বিদেশি সহায়তায় বাজেটের প্রায় ৭০% পূরণ হতো। এখন আমরা প্রায় ১২ লাখ কর্মচারীর বেতন দিচ্ছি এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব প্রতিদিনই বাড়ছে।
যুগান্তর : বর্তমানে আফগানিস্তানের ২ কোটি ২৯ লাখ মানুষ (জনসংখ্যার অর্ধেক) মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা বন্ধ করেছে। তালেবান সরকার কীভাবে এই মানবিক সংকট মোকাবিলা করছে?
ফারাই : ইসলামিক আমিরাত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হাজারো সাহায্যপ্রার্থীর মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৬ লাখ বিধবা ও এতিমকে মাসিক সহায়তা দেওয়া হয়। বহু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জাতীয় সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। যদি তা মুক্ত করা হয়, তাহলে আমরা আরও সহায়তা দিতে পারব। সীমিত সম্পদেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
যুগান্তর : আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিলিয়ন ডলার সম্পদ জব্দের ফলে আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর সমাধান কীভাবে সম্ভব?
ফারাই : হ্যাঁ, সম্পদ জব্দ ও ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা বড় প্রভাব ফেলেছে। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিকল্প উপায়ে আর্থিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করি, অন্যায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে এবং আমাদের সম্পদ ফেরত দেওয়া হবে।
যুগান্তর : রাশিয়া ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রাষ্ট্রদূত গ্রহণ করেছে। আরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
ফারাই : হ্যাঁ, রাশিয়া ইসলামিক আমিরাতকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং অনেক দেশ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আমিরাত নিজের দিক থেকে সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব এগিয়ে এসে আমাদের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া।
যুগান্তর : জাতিসংঘ এখনো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং ২০২২ সালে তালেবানদের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করেছে। জাতিসংঘে আফগানিস্তানের আসনটি এখনো আগের সরকারের প্রতিনিধিদের কাছেই রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আপনারা কী করছেন?
ফারাই : আপনি যেমনটি বলছেন, আফগানিস্তানের জাতিসংঘের আসনটি এখনো ইসলামিক আমিরাতকে দেওয়া হয়নি- এটি অন্যায়। আমরা আশা করি, জাতিসংঘ তাদের দায়িত্ব পালন করবে এবং আসনটি আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের হাতে হস্তান্তর করবে। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। কিছু পক্ষ মার্কিন প্রভাবের কারণে এটি আটকে রেখেছে।
যুগান্তর : সম্প্রতি ভারত চেনাব নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। আপনারা কুনার নদীতে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন, যা পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণরেখা। এটি কি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে নতুন যুদ্ধ ডেকে আনবে?
ফারাই : না, আমরা কখনো প্রতিবেশীদের ক্ষতি করতে চাই না। পানি ব্যবস্থাপনা আফগানিস্তানের অধিকার। সেটা পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর বা দক্ষিণ- যেখানেই হোক না কেন। কুনারে যদি বাঁধ তৈরি হয়, সেটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হতে পারে এবং আমরা পাকিস্তানকেও বিদ্যুৎ দিতে পারি। এটি ক্ষতিকর নয়, বরং এটি আমাদের ন্যায্য উন্নয়ন অধিকার।
যুগান্তর : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত এখন আপনাদের আঞ্চলিক সমর্থক। ভারতই কি তাহলে আপনাদের ‘আঞ্চলিক বস’? আপনার কি মনে হয় না যে ভারতের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠ কূটনীতি মেনে নেবে না চীন এবং পাকিস্তান পরিস্থিতি কাজে লাগাবে। যখন পাকিস্তানও তার আরেক প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে।
ফারাই : না, এই দাবির কোনো সত্যতা নেই। আমরা সব প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক চাই। আমরা অন্য দেশের নির্দেশে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব বা বৈরিতা করি না। ইসলামি মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই আমাদের নীতি। কেউ আমাদের অন্যের অনুগত ভাবার ধারণাটি একেবারেই ভুল।
যুগান্তর : তালেবান সরকারের প্রথম উচ্চপর্যায়ের বিদেশ সফর ছিল ভারতে। পাকিস্তান, ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও চীনের মধ্যে আপনার কোন প্রতিবেশীর সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক?
ফারাই : আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সব প্রতিবেশীর সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো। উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, চীন, ইরান, এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও। পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে, যা আমরা স্বাভাবিক করতে চাই। আমরা সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চাই এবং পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বিশেষভাবে মূল্যবান। আমরা সম্পর্কের টানাপোড়েন চাই না।
যুগান্তর : বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে তালেবান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে?
ফারাই : কিছুদিন আগে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল সফর করেছিল। আমরা তাদের যথাযথ সম্মান ও আতিথেয়তা করেছি। আশা করি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক বিকশিত হবে। ইসলামিক আমিরাত বাংলাদেশকে একটি মুসলিম এবং ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসাবে দেখে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তুত। আমাদের নীতি অর্থনীতিকেন্দ্রিক এবং এর মাধ্যমে আমরা প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চাই।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারাই : আপনাকেও।