Image description

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের চার মাস পূর্তির প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শরিকদের মূল্যায়ন, জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি, যুগপৎ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাজকুমার নন্দী

আগামীর সময়: বিএনপির নেতৃত্বে ৪২টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে ছিল। সরকার গঠন করতে পারলে শরিকদের মূল্যায়ন করার কথা ছিল বিএনপির। সে হিসেবে নির্বাচনে কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়া এবং দুই শরিককে প্রতিমন্ত্রীও করেছে। কিন্তু ৪২টি দলের মধ্যে ৩১টি কিছুই পায়নি। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এটি বলতেই পারেন, যেভাবে কথা ছিল সেভাবে কথা তারা রাখেনি। বলা হচ্ছে, ৪২টি দলের মধ্যে ৩১টি কিছুই পায়নি। মানে কী পাওয়ার আশা করেছে তারা? আমার কথা বলি, আমি কোনো কিছু পাওয়ার আশা করিনি। যদিও আলোচনা ছিল— আমি যদি এমপি হতে পারি, তাহলে মন্ত্রী হব। হার্টের সমস্যায় আমি যখন সিসিইউতে ছিলাম, তখন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল— আপনি মন্ত্রী হন, নির্বাচন করতে হবে না বা নির্বাচন করবেন না। তখন বলেছিলাম, এখন নির্বাচনই হলো সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্রিয়া। সে ক্রিয়াকর্ম বাদ দিয়ে আমি মন্ত্রী হতে যাব কেন? আমি নির্বাচন করব, তারপর মন্ত্রী হব কি হব না, সেটা পরবর্তী সিদ্ধান্ত। সুতরাং পাওয়ার ব্যাপারটি আমি বলব না এখানে।

তবে এটি বাস্তবতা, ২৮ অক্টোবর ঢাকায় যখন বিএনপির মিটিংকে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিল, তারপর লম্বা সময় বিএনপিকে মাঠেই পাওয়া যায়নি, কাউকেই মাঠে পাওয়া যায়নি। তখন আমরা ধারাবাহিকভাবে মাঠে ছিলাম, বিশেষ করে গণতন্ত্র মঞ্চ। আমরা এই যে মার খেয়ে, গুলি খেয়ে, জেল খেটে আন্দোলন করলাম, আমাদের নেতাকর্মীরা করল, তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা— এটি তো কোনো রাজনীতি নয়। সে অর্থে যদি মূল্যায়ন করার কথা বলেন, নিশ্চয়ই তারা শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি।

যদিও রাজনীতি তো এমনিতেই খুব জটিল বিষয়, ক্রিটিক্যাল এবং এটির ডিপ্লোম্যাটিক ম্যানুভারিং, কলাকৌশল এমন হয়— যা সবার বোধের মধ্যে আসে না। তবে এটি আমি বলব, রাজনীতিতে দেওয়া ওয়াদা ফেরত নেওয়া যায় না। সেটি বাস্তবায়ন করতে হয় অথবা এক্সপ্লেইন করতে হয় কেন পারলাম না, তাতে যদি জনগণ সন্তুষ্ট হয়। বিএনপি কিছুই করেনি।

আগামীর সময়: আপনি বগুড়া-২ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন করেছিলেন। বিএনপি সেখানে প্রথমে আপনাকে সমর্থন দিলেও পরে দলের এক নেতাকে মনোনয়ন দেয়। বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে আপনার হারটা নিশ্চিত করা হলো। তাহলে বিএনপি কি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করল?

মান্না: কথা তো আমাকে দিয়েছিল; কিন্তু কথার বরখেলাপ করেছে। কেন আমার নাম ঘোষণা করা হলো? তারপর কেনইবা আমার বিরুদ্ধে আরেকজনকে দেওয়া হলো? আমি জানি না এখন পর্যন্ত। সেখানে বিএনপি তাদের দলীয় প্রার্থী দিল, সেটা আমার হার নিশ্চিত করেছে— বিষয়টি এমন নয়। ওই এলাকায় খোদ তারেক রহমান গেছেন, মিটিং করেছেন, বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিতে বলেছেন এবং কী কী উন্নয়ন করবেন, সেগুলো বলেছেন। মানুষ কী দেখবে— বিএনপির মূল নেতা, জিতলে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তিনি যখন বলছেন, এগুলোর প্রভাব তো পড়েই। সে রকম প্রভাব পড়েছে বাস্তবে। তবে তাদেরকে কেন এরকম একটি পজিশন পাল্টাতে হলো, এখন পর্যন্ত তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে আসেনি।

আগামীর সময়: বিএনপির অঙ্গীকার ছিল, আওয়ামী সরকার হঠানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। নির্বাচনের পর তারা দুই শরিককে সরকারে স্থান দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠিত হয়ে গেছে বলে মনে করেন কি না?

মান্না: বিএনপি বলেছিল, জাতীয় সরকার গঠন করবে। কিন্তু সেটার কোনো লক্ষণ নেই। একটা-দুটা প্রতিমন্ত্রী বানানোয় জাতীয় সরকার হয়ে যায় না। সেটাতে এ কথা প্রমাণিত হয় না, তারা তাদের জাতীয় সরকারের ওয়াদা রেখেছে। যে কাউকেই জিজ্ঞেস করুন— এখন ক্ষমতায় কারা আছে? সবাই বলবে বিএনপি আছে। সুতরাং এটি কোনো জাতীয় সরকার নয়, এটি বিএনপির সরকার এবং এটি বিএনপির সরকার হিসেবেই চলছে এখন পর্যন্ত। এর মধ্যে শরিকদের থেকে যে দুজন প্রতিমন্ত্রী আছেন, তারা নিজেরা বলতে পারবেন— তারা এখানে কত আরামে আছেন, ভালো আছেন, তারা কতটা ঐকমত্যের সরকার হিসেবে পরিচালনা করতে পারছেন। আমি এরকম দেখি না।

আগামীর সময়: এ অবস্থায় একটি শরিক দলের শীর্ষনেতা হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের করণীয় কী বলে মনে করেন আপনি।

মান্না: শরিকদের সম্পর্কে বলার আগে আসলে নিজে কী করব, সেটা ঠিক করতে হবে। আমাদের একটা মঞ্চ ছিল— গণতন্ত্র মঞ্চ। সেখান থেকে একজন মন্ত্রী হয়েছেন। এখন আমরা যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিই, সরকারের সমালোচনা করি, তাহলে তিনি তো আমাদের সঙ্গে আসতে পারবেন না। আরেকজন আগেই জোট ছেড়ে চলে গেছেন। রইলাম চারটা দল। তার মধ্যে একটা দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, যেটির সাধারণ সম্পাদক নমিনেশন পেয়েছিলেন, েজতেননি। তিনি অসন্তুষ্ট আছেন সরকারের ওপর। তিনি হয়তো মনে করেন, বিএনপির প্রার্থী যদি তার প্রতিদ্বন্দ্বী না হতো, বিএনপি তাকে আরও ভালো করে কন্ট্রোল করত, তাহলে তিনি জিততে পারতেন। বিএনপি সেটি করেনি, সেজন্য মন খারাপ আছে। কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে ঠিক কী স্টান্ট নেবেন, তা জানি না।

সার্বিকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আমরা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করব। সেই সমালোচনাগুলোর রেকটিফিকেশন করার মতো সময় আছে তাদের (সরকার)। দেখব এটা। তারপর রাজনীতি যে ধারায় নিয়ে যাবে, সে ধারায় যাব আমরা— এটিই স্বাভাবিক।

আগামীর সময়: চার মাস পার করল বিএনপির সরকার। এ অবস্থায় সরকারকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মান্না: এখনই বলা যাবে না, মাত্র চার মাস গেল। সরকারের মূল্যায়ন করার জন্য এটি যথেষ্ট সময় নয়। কারণ, এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। তবে অ্যাজ গভর্নমেন্ট, এই চার মাসে গভর্নমেন্ট হ্যাজ গেইন নাথিং। কেন বলছি, মানুষ যে বিরাট আশা নিয়ে, ব্যাপকভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে— মানুষের মধ্যে সে আশাবাদের কোনো স্ফুরণ, কোনো জাগরণ আমি দেখি না। বরং আমি দেখি, মানুষের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

জনগণ বলছে— জিনিসপত্রের দাম এত বেশি, তাহলে আমাদের কী লাভ হলো? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এত খারাপ, কই সরকার তো কিছু করতে পারছে না। তারপর বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারি যে কমে গেছে— তা তো না। ভেতরে ভেতরে ঠিকই চলে এবং লোয়ার লেভেলে এগুলো সবই আছে। দেশে কোনো বিনিয়োগ নেই, চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে কোনো নিয়োগ নেই। সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে একটা হতাশার চিত্রই আছে। তবে আমি মনে করি, এই চার মাসে সরকারের আরও জনপ্রিয় থাকার কথা ছিল। সরকারের পক্ষে মানুষের কথাবার্তা বলার দরকার ছিল বেশি। কিন্তু মিডিয়াগুলোকে আমি সমালোচনামুখর দেখছি বেশি। তাই আমি মনে করি, সরকারের সাকসেস রেট খুব বেশি নয়।

আগামীর সময়: অভিযোগ আছে, বিএনপির হাত ধরে অনেক জায়গায় পতিত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হচ্ছে। এ অবস্থায় বিএনপির রাজনীতির গতিপথ, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী?

মান্না: বিএনপির হাত ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হচ্ছে, সে কথা আমি বলব না। কারণ, পার্লামেন্টে যখন সিদ্ধান্ত হয়েছে— আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তখন পার্লামেন্টে আরেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো শক্তি নেই, তাদেরকে আইনগতভাবে আবার রাজনীতি করার সুযোগ দেয়। এর আগে যেটা ছিল— সরকারি আদেশ, সেই আদেশ দিয়ে হয়তো তখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পেরেছে; কিন্তু এখন তো আর এটা করতে পারবে না। সেদিক থেকে তারা (সরকার) প্রায় আওয়ামী লীগের জন্য রাস্তাটা বন্ধ করে দিয়েছে।

এখন আওয়ামী লীগও যদি ফিরতে না পারে, বিএনপিও যদি ভালো না করে, আবার জামায়াতে ইসলামীও খুবই দ্বিধার মধ্যে রয়েছে। তারা অনেক বছর পর যে সুযোগটা পেয়েছে, একটা গোলমাল লাগলে সে সুযোগটা হারিয়ে যায় কি না— সে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে জামায়াত। তারা এই সরকারের বিরুদ্ধে দরকার হলে একটা আন্দোলন করবে— বিরোধী দল যেটা করে, সে ভূমিকাও নিচ্ছে না। তাদের মধ্যে ভয় আছে,— এসব করতে গেলে আওয়ামী লীগ না আবার শক্তিশালী হয়, আবার না তারা ফেরত আসে। এ কারণে জামায়াত কিন্তু ইতিবাচক নিষ্ক্রিয় বিরোধী দল। কোনো ভূমিকাই নেই তাদের। পার্লামেন্টে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও যত জোরে কথা বলতে পারেন, তারা সে জোরেও কথা বলতে পারেন না। অর্থাৎ একটা ‘গ্রে এরিয়া’ তৈরি হয়েছে সব পলিটিকসের মধ্যে। সব মিলিয়ে আমি বলব, পলিটিকসটা এখনো ঘোলাটে টাইপের বা আনসেটেল্ড টাইপের আছে। দেখা যাচ্ছে না কী হচ্ছে, কী হবে তাও বোঝা যাচ্ছে না।

আগামীর সময়: জামায়াতে ইসলামী আগে বিএনপির মিত্র থাকলেও তারা এখন সংসদের বিরোধী দল। সরকার তাদের ঠিকমতো হ্যান্ডেল করতে পারছে কি না?

মান্না: হ্যান্ডেল করার তো প্রশ্ন নেই, তাদের সঙ্গে তো নীতিগত বৈষম্য রয়ে গেছে— মানে পার্থক্যই রয়ে গেছে। সংস্কার প্রশ্নে তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে, অধ্যাদেশগুলো নিয়ে পার্থক্য হয়েছে তাদের মধ্যে। জুলাই সনদ নিয়েও পার্থক্য হয়েছে। এগুলো হ্যান্ডেল করতে পারে— যদি এগুলো যে রকম করে হওয়ার কথা ছিল, সে রকম করে তারা করত— তা তো করছে না।

এই যে সংবিধান সংস্কার বা সংশোধন যা-ই বলি, এটা নিয়ে কী হবে? তারা সংস্কার পরিষদ করার কথা বলেছিল বা আমরা সবাই বলেছিলাম, সেটা বিএনপি করবে না। আবার ইলেকশন ম্যানিফেস্টো তাদেরটা (বিএনপি) পাস হয়েছে, সেখানে সংস্কার পরিষদ নেই। তারা সংবিধান সংশোধন করার কথা বলবে, পার্লামেন্টের মাধ্যমে পাস করতে চাইবে— তার মানে তাদের একাই করতে হবে। আমি শুনলাম, জুলাই মাসে এটা তারা একাই করতে চায়। করবে; করলে পরে বিএনপির এই ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে তখন জামায়াতের ভূমিকা কী হবে, সেটা দেখতে হবে।