Image description

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ছাত্রদলের বর্তমান হালহকিকত, নতুন কমিটি গঠন ও সরকারের নানা কার্যক্রমে ছাত্রদলের ভূমিকা কেমন হবে— এসব বিষয় নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাকারিয়া নূরী

 

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের রাজনীতিতে আপনি কখন, কীভাবে যুক্ত হলেন?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমি বড় হয়েছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সেখানেই। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তারপর উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছি নোয়াখালী সরকারি কলেজে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগ পর্যন্ত আমি কোনো রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছি। সেটি ২০০৮ সালের পরে। অর্থাৎ, আমি ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছি। আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছে ২০০৮ সালের পরে। তারপর থেকে আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ বা শিক্ষা, ঐক্য, প্রগতির যে স্লোগানবাহী সংগঠন—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছি। তো এটি বলা চলে যে, ২০০৮ সালের আগে আমি কোনো রাজনীতি বা রাজনীতির যে পরিক্রমা—এগুলো কোনো কিছুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। একদম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরই রাজনীতি শুরু।

 

এশিয়া পোস্ট: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মী নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে। সে সময়ে আপনার অভিজ্ঞতাগুলো যদি বলতেন।

 
 

 

নাছির উদ্দীন নাছির: দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের রাজনীতি করতে হয়েছে। এখন দায়িত্বে রয়েছি। বিভিন্ন পদ-পদবিতেও ছিলাম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জন্য সব থেকে বড় পরীক্ষা হয়েছিল ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলনে। বিনা ভোটের নির্বাচনের আগে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছিল, ওই সময়টা সব থেকে খারাপ ছিল। সেটি ছিল লম্বা ১৭ বছরের শাসন আমল। সব থেকে বেশি গুম-খুনের ঘটনা শুরু হয়েছে ২০১৩-১৪ সাল থেকে। যে নির্বাচনকে প্রতিহত করতে আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছি, সে আন্দোলন থেকে ছাত্রদলই সবচেয়ে বেশি বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে সামনের সারিতে ছিল। সেখানে আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন, গুম হয়েছেন—এখনো তাদের পাওয়া যায়নি। সুতরাং, সে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে আমিসহ আরও কয়েকজনকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ দ্বারা নির্যাতিত হতে হয়েছে। ২০১০ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন হলে ছিলাম, তখন হলের ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছি। এগুলো আমাদের সব সহকর্মীদের জানা। এর বাইরে তো সব আন্দোলন-সংগ্রামে কমবেশি নির্যাতন, পুলিশি হামলার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে।

 

২০২৪-এর ৩০ ও ৩১ জুলাই বাংলাদেশের মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল পতাকা, লাল ব্যাজ ধারণ করা হয়েছিল। কেউ প্রোফাইল লাল করেছে এবং গুটি কয়েক মানুষ কালো করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ৩০, ৩১ জুলাই এবং ১, ২ ও ৩ আগস্ট আমরা খুবই ব্যস্ত—কখনো মাঠে, কখনো পলিসি মেকিংয়ে। এগুলোর মধ্যেই আমরা ছিলাম। পরে ৫ তারিখের কর্মসূচির বিষয়ে ৪ তারিখ রাতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো। প্রোগ্রামটা শিফট করে ‘ঢাকা চলো’ চূড়ান্ত কর্মসূচি দেওয়া হলো, যেটি জনাব আসিফ দিলেন।

 

৫ আগস্ট ভোর রাতে আমি ছিলাম বনশ্রীতে। সেদিন বনশ্রী থেকে ভোর রাতে (রাতের শেষ দিকে) পুলিশের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিশেষ ব্যবস্থাতে আমাকে প্রেস ক্লাবে নিয়ে আসে। সেখানে আমরা একটা রুমে ছিলাম। তখন ইন্টারনেট একদম বন্ধ। মানে কোনো ধরনের ইন্টারনেট ছিল না এবং স্বাভাবিক মোবাইলের ইন্টারনেটও পাওয়া যাচ্ছিল না। একদম ফজরের পরপরই আমাকে সেখানে রেখে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে একজন সাংবাদিকও ছিলেন। এখানে আমাদের নেতাকর্মীরা আসবে, আমরা যেন ইন্সট্রাকশন দিতে পারি সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পুলিশের কয়েকজন ছিলেন আমাদের সঙ্গে। যাদের সে সময় সরকারি কোনো দায়িত্ব ছিল না। সেসময় তারা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। সকালে প্রথম শুনতে পেলাম, ঢাকা মেডিকেলের ভেতর থেকে অনেক লোক শহীদ মিনারে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, বিজিবি তাদের গুলি করেছে। তখন সকাল সাড়ে ছয়টা কি সাতটা। শুনলাম ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের এক নেতা সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু ক্রস চেক করতে পারছি না, যেহেতু ইন্টারনেট সমস্যা। গুলিবিদ্ধ সেই নেতার নাম আশরাফ শাহরিয়ার। তার পায়ে গুলি লেগেছিল, এখন সে মোটামুটি সুস্থ আছে।

 

তারপর আরেকটু বেলা বাড়তে ছাত্রদলের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের পর সিদ্ধান্ত হলো যেভাবে হোক আমরা শাহবাগে যাব। পরে আমরা মাস্ক পরে তিনজন হেঁটে একদম স্বাভাবিকভাবে সাধারণ মানুষের মতো শাহবাগে যাই। গিয়ে দেখি রাস্তায় তেমন খুব বেশি মানুষ নেই। পুলিশেরও যে খুব তৎপরতা আছে তাও না। একটি-দুটি আর্মির গাড়ি, বিজিবির গাড়ি দেখা যাচ্ছিল। তখন এক ধরনের ভয়-শঙ্কা তো ছিলই, যেহেতু আমি একটি দায়িত্বে রয়েছি। অন্য যে কারও থেকে আমার একটু শঙ্কা তো থাকেই।

 

পরে আমরা দোয়েল চত্বর হয়ে ঢাকা মেডিকেলে গেলাম। ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার পরে দেখি এক ভিন্নচিত্র। সেখানে যত মানুষ হাসপাতালের ভেতরে আছে, তারা আসলে কেউ রোগী না, রোগীর সঙ্গে না। সব মানুষ আন্দোলনে এসেছে এখানে। আমি মাস্ক খুললাম, কেননা সবাই আমাকে মোটামুটি চেনে। আমাকে দেখে সবাই বলেছে, ভাই বের হতে হবে, বের হতে হবে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে একবার একদম অনেক সংখ্যক লোক ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগ দিয়ে শহীদ মিনারে প্রবেশ করছিল। তখন পুলিশ ভালোভাবে গুলি করেছিল, খুব ভালোভাবে। ৫ আগস্টে এ অঞ্চলে সব থেকে বেশি গুলির ঘটনা এটা। তারপর এখানে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। অনেকে আহত হয়েছে। পরে আবার সবাই হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যায়।

 

সেদিন যেহেতু ইন্টারনেট বন্ধ ছিল সেহেতু কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার মোবাইলে আমার এক বন্ধু আমেরিকা থেকে ফোন করে জানায়—বাংলাদেশে শুধু বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়েছে যে, লাখ লাখ জনতা শাহবাগে প্রবেশ করছে। তারা উত্তরা এবং কামরাঙ্গীরচর দিয়ে শাহবাগের দিকে যাচ্ছে। তখন অলরেডি সকাল সাড়ে ১০টা-১১টা। তারপর আমরা এখানে কিছুক্ষণ থেকে শাহবাগে গেলাম। তখন প্রায় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা বা আরেকটু পরে। তখন শাহবাগে লক্ষ করলাম অসংখ্য মানুষ, বিশেষ করে আমাদের ছাত্রদলের। সেখানে অনেকেই আর্মিকে ফুল দিচ্ছিল। তখন দুপুর সাড়ে ১২টা-১টা বেজে গেছে। আমরা শুনতে পাচ্ছি, শেখ হাসিনা চলে গেছে। আবার অনেকে বলছে, আগের রাতেই চলে গেছে। তখন আমি শাহবাগে ছিলাম।

 

এশিয়া পোস্ট: ২০২৪-এর আন্দোলনে ছাত্রদল সামনের সারিতে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচনে কেন প্রত্যাশিত ফলাফল আসেনি? এর কারণ কী বলে মনে করেন?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: প্রথমত আমার যেটি মনে হয় সেটি হচ্ছে—ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য যে পর্যাপ্ত সময় ছাত্র সংগঠনগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় দেওয়ার কথা ছিল সেটি কোনোভাবেই নিশ্চিত করা হয়নি। এটি আমাদের সবসময় দাবি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তড়িঘড়ি করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে জিতানো তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এবং সেটিতে তারা সফল হয়েছে। ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরোধীরা স্বাভাবিক পলিটিক্স করতে পারেনি। ছাত্রদলের একজন সর্বশেষ সদস্য বা সমর্থক যদি ছাত্রদল বা আমাদের চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান বা ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) ফেসবুক পেজে একটি লাইক দিয়েছেন বা কমেন্ট করেছেন তাকেও হল ছাড়া করেছে, ক্যাম্পাসে যেতে দেওয়া হয়নি, পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়নি। সেরকম একটি সংগঠনকে মাত্র কয়েক মাসের মাথায় এরকম একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন বাকি যারা নির্বাচনে জিতেছে—ধরুন ভিপি, জিএস হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের শাসনামলে হলে থেকেছে, ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে। তারা গুপ্তভাবে রাজনীতি করেছে। গুপ্তভাবে রাজনীতি করে তারা এর সফলতা পেয়েছে। আমি মনে করি, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হারার পেছনে দায়িত্ব আমাদের নিশ্চয়ই রয়েছে, এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো রেজাল্টকে একপেশে করতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে।

 

এশিয়া পোস্ট : শিগগিরই ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি দেওয়ার আলোচনা চলছে। ছাত্রদলের নেতৃত্ব বাছাইয়ে কোন কোন বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়? কবে এ নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমাদের (ছাত্রদলের) ২০১৯ সালে সর্বশেষ যে কাউন্সিল হয়েছে সেখানে ছাত্রদলের সব কাউন্সিলর দলের চেয়ারম্যান (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানকে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। ছাত্রদলের সেন্ট্রাল কমিটির কমিটি গঠন, কমিটি স্থগিত করা ও নতুন কমিটি করা সব কিছুর সিদ্ধান্ত তারেক রহমানকে নেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তিনি যখন চাইবেন তখন কমিটি হবে। তিনি কমিটি দেওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান কমিটি দায়িত্ব পালন করবে। আমাদের গঠনতন্ত্রে এটিই নিয়ম। গত ১ মার্চ আমাদের (কমিটির) মেয়াদ শেষ হয়েছে। যখন তিনি প্রয়োজন মনে করবেন তখন কমিটি হবে।

 

নতুন নেতৃত্বে কে আসবে সে প্রশ্নে আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের অধিকারের জন্য যারা কাজ করতে পারবে, পাশাপাশি সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে যাদের সক্ষমতা বা যোগ্যতা তৈরি হয়েছে বা পার্টি মনে করবে যে এই সক্ষমতাগুলো তার মধ্যে রয়েছে—নিশ্চয়ই সে নেতৃত্বে আসবে।

 

এশিয়া পোস্ট : ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একসঙ্গে পথ চললেও পরবর্তীতে দুই সংগঠন বিরোধে জড়াচ্ছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: একসঙ্গে কাজ করেছি বলতে একই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে আমরা কাজ করেছি—এটা ঠিক। আর বিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের দিক থেকে আসলে কোনো বিরোধ নেই অর্থাৎ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো বিরোধ নেই। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে বিরোধের যে এলিমেন্ট প্রাসঙ্গিকতাগুলো প্রথম তৈরি হয়েছে প্রত্যেকটির জন্য ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করা হয়েছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান চলার সময়ও যখন নয় দফা প্রণয়ন হচ্ছিল তখন ছাত্রদলের সঙ্গে যারা সমন্বয়ক ছিল তাদের একটি বিষয়ে মতভেদ হয়েছিল যে, সপ্তম দফায় দলীয় ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আমরা তখনই সুস্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করেছিলাম। আমাদের বিরোধিতার কারণে সপ্তম দফা নিয়ে বলা হয়েছে এটি আসলে নবম দফার মধ্যে থাকবেই না। পরবর্তীতে আসলে একদফার মধ্যে আমরা চলে গিয়েছি, এটা নিয়ে খুব বেশি আলাপ-আলোচনা হয়নি।

 

পাঁচ আগস্টের পর প্রতিটি ক্যাম্পাসে এরকম মানববন্ধন করা হয়েছিল যে, দলীয় ছাত্ররাজনীতি থাকবে না। এমনকি রাজনীতি থাকবে কি, থাকবে না এ বিষয়ে এক ধরনের তর্ক-বিতর্ক চলেছে। এর প্রতিটি বিষয় সামনে এনেছে শিবির। একদিকে ক্যাম্পাসে তারা দলীয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে ক্যাম্পেইন করেছে, আরেক দিকে তারা তাদের কমিটিগুলো প্রকাশ করেছে। যারা প্রতিটি ক্যাম্পাসে এই মানববন্ধনগুলোতে নেতৃত্ব দিয়েছে যে, দলীয় ছাত্ররাজনীতি থাকতে পারবে না, তারা পরবর্তীতে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পদে পদায়িত হয়েছে। এটি একটি ফ্যাক্ট। আর দ্বিতীয় হচ্ছে—যারা পাঁচ তারিখের পর থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে যেমন—সাদিক কায়েম, ফরহাদসহ তারা অতীতে লম্বা সময় ধরে ছাত্রজীবনের পুরোটা সময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছে, মিছিল-মিটিং করেছে। এমনকি জামায়াতের বিরোধিতাও করেছে অর্থাৎ জামায়াতের আন্দোলনকে ব্যাহত করা সেই মিছিলগুলোতে তারা অংশ নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তারা যখন ছাত্রশিবিরের এরকম দায়িত্বে চলে আসছিল তখন এক ধরনের বিরোধ তৈরি হচ্ছিল। সর্বশেষ যেটি সেটি হচ্ছে—ক্রমাগত ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হচ্ছিল—যেটাই ছাত্রলীগ, সেটাই ছাত্রদল। ছাত্রদলের ১৪২ নেতাকর্মী জুলাই-আগস্টে শহীদ হয়েছেন। সেই কন্ট্রিবিউশনকে বলা হয়েছে ১০০ পারসেন্ট সেলিব্রেশন, ০ পারসেন্ট কন্ট্রিবিউশন। এগুলো থেকে আমার মনে হয়েছে এ সম্পর্কগুলো দিন দিন অবনতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। আমরা কখনোই কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ চাই না।

 

এশিয়া পোস্ট: দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত বা তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: কেমন রাজনীতি থাকবে সেটি তারা নির্ধারণ করবে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কোনোভাবে অন্তত গুপ্ত রাজনীতি থাকা উচিত না। অন্তত বাংলাদেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রকাশ্যে রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে, আবার রাজনীতি না করারও অধিকার রয়েছে। কিন্তু কোনোভাবে গুপ্ত রাজনীতি করার আমার মতে কোনো অধিকার নেই। আমার মনে হয়, গুপ্ত রাজনীতি শিবিরের অন্তত এখন পরিহার করা উচিত। আরেকটি বিষয় হচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষোদ্গার বা কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে শিবির যদি বের হয়ে আসে তাহলে ভালো হবে। তবে এতে অন্য দলগুলোও রয়েছে। এই ধারায় যে ছাত্রদল জড়াচ্ছে না আমি সেটিও মনে করি না।
আরেকটি হচ্ছে—নারীর চরিত্র হননের জন্য ছাত্রশিবির এবং তাদের আইডিগুলো দায়ী থাকে। আমাদের সমালোচনা তো অনেকেই করেন। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, ছাত্রদলের কোনো আইডি থেকে আপনার চরিত্র হনন বা আপনাকে নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করা হয় না। হয়তো নারেটিভ দেওয়া হয়, পালটা যুক্তি দেওয়া হয়। ধরুন আপনি একটি বিষয়ে সমালোচনা করলেন, পরে তাদের একটি আইডি থেকে আপনার সমালোচনা হবে না, এরকম ৫০০০ আইডি থেকে একসঙ্গে আপনার চরিত্র হনন করা হবে। পাঁচ আগস্টের পরের রাজনীতিতে এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। একইসঙ্গে ছাত্রশিবিরের যে প্রতারণাপূর্ণ মনোভাব—মুখে এক, মনে আরেক। এই রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

 

এশিয়া পোস্ট : ছাত্রদলের অভ্যন্তরে নানা সংঘর্ষ ও বিরোধ দেখা যায়। কেন এমন হয়? অভ্যন্তরীণ এসব সংঘাত এড়াতে আপনাদের কি কোনো দলীয় পরিকল্পনা আছে?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: কিছু কিছু জায়গায় তো হচ্ছে, আমরা অস্বীকার করছি না। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্ররাজনীতির একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমি এটাও বলছি না যে, একদম পুরোটাই ঠিক হয়েছে। আমি মনে করি, আমাদের পরিশুদ্ধের জায়গাতে আরও অনেক দূর কাজ করতে হবে। তবুও ধীরে ধীরে হচ্ছে। আমি মনে করি, ছাত্রদলের প্রতিটি নেতাকর্মী সতর্ক থাকবে এবং যেন বিরোধপূর্ণ নেতিবাচক শিরোনাম ছাত্রদল না হতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। আমরা আশা করছি, আমরা সফল হবো। আমাদের চোখে ধরা পড়লে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। কেউ যদি বেশি অন্যায় করে তবে আমরা পুলিশকেও চিঠি দিচ্ছি—প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা আশা করছি, ইনশাল্লাহ এগুলো ধীরে ধীরে কমে আসবে।

 

শিয়া পোস্ট: ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারি হামিমকে অব্যহতি দেওয়ার বিষয়ে অনেকে সমালোচনা করছেন। তাকে অব্যহতি দেওয়ার মূল কারণ কী? তাকে ছাত্রদলে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে কিনা?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: অবশ্যই, সুযোগ তো রয়েছে। আমাদের এ সংগঠনে যে রকম পানিশমেন্ট আছে, সেরকম রিওয়ার্ডও আছে। এটি তো সাময়িক পদ স্থগিত। এতেই বোঝা যাচ্ছে অবশ্যই তার সুযোগ রয়েছে। একটি সংগঠন নিয়মের মধ্যে চলে, এমনকি আমাকেও নিয়মের মধ্যে চলতে হয়। আমি তো যা তা করতে পারছি না। বরং আমি সামান্য ভুল করলেও তা পরিমাপে চলে আসব। বরং বেশি আসবে নেতৃত্বের জায়গা থেকে। কেউ এখানে কোনো ছাড় দেবে না—গণমাধ্যম, সংগঠন বা সংগঠন যারা দেখাশোনা করেন তারা। সংগঠনের মনে হয়েছে তানভীর বারী হামিম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন সেজন্য তাকে আমরা শোকজ করেছি। আর তিনি শোকজের জবাব যেটি দিয়েছেন সংগঠনের কাছে তার জবাবটি ইতিবাচক মনে হয়নি। সেজন্য আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তারপরে তার সুযোগ আছে অ্যাপ্লিকেশন করার। তিনি অলরেডি তা করেছেন বোধহয়, আমি শুনেছি। সেটি যাচাই-বাছাই হচ্ছে। তারপরে আমাদের একটি টিম কাজ করছে। যখনই মনে হবে যে এটি তুলে নেওয়া হবে, তখনই তুলে নেওয়া হবে।

 

এশিয়া পোস্ট: শোনা যাচ্ছে, সংসদে উচ্চ কক্ষ হলে আপনি সেখানে সদস্য হিসেবে মনোনীত হতে পারেন। এমন সম্ভাবনা আছে কিনা? উচ্চ কক্ষের সদস্য হলে আপনার ভূমিকা কী হবে?
নাছির উদ্দীন নাছির: আমি জানি না এটা হবে কি না। অনেক দেশে এমনটা রয়েছে। যেমন—ইন্ডিয়া, আমেরিকাসহ এমনটা অনেক দেশেই আছে। যেহেতু বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটা খুবই নতুন। এটি কেমন হবে তা আরও পরে বোঝা যাবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে আমার খুব একটা আগ্রহ নেই। প্রচলিত ধারায় নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে যাওয়ায় আমার আগ্রহ রয়েছে। তখন হয়তো তা নিম্নকক্ষ হবে। উচ্চকক্ষে অনির্বাচিতভাবে যাওয়া আমার কাছে খুব বেশি ফ্যাসিনেটেড মনে হচ্ছে না। এটি আমার অভিমত। তারপরে এগুলো দলের সিদ্ধান্ত।

 

এশিয়া পোস্ট: সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত যদি শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে যায় তাহলে ছাত্রদল কি প্রতিবাদ করবে? সরকারের সমালোচনা করবে?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমি মনে করি, সমালোচনা যৌক্তিকভাবে করা উচিতি। যদি মনে হয় যে, সরকার ভুল করেছে, আমি মনে করি প্রতিবাদ করা উচিত যৌক্তিকভাবে। যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিএনপির সহযোগী অঙ্গ সংগঠন, অন্য কেউ যেভাবে প্রতিবাদ করবে ছাত্রদল হয়তো সেভাবে করতে পারবে না। এটি মৌলিক শৃঙ্খলার বাইরে। এটি আসলে দুভাবে করা যেতে পারে। একটি হচ্ছে—অফিশিয়ালি। যেখানে কথা বললে সে সিদ্ধান্তটি পরিবর্তন, পরিমার্জনের সুযোগ আছে সেখানে কথা বলতেই পারি। যেমন— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যারা সভাপতি হবেন পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী তাদের যোগ্যতা স্নাতক পাস বোধহয় শিথিলের চিন্তাভাবনা চলছে। এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছেও মনে হয়েছে যেহেতু স্নাতক পাসটাকে মানুষজন গুড অ্যাপ্রিশিয়েশন দিয়েছে, সেহেতু সরকারের সে জায়গায় থাকা উচিত। এ বিষয়ে আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখিনি, তবে আমি আমাদের শিক্ষামন্ত্রীকে মেসেজ করেছিলাম— ‘যদি আগের সিদ্ধান্তটি রাখা যায় সেটি সব থেকে কল্যাণকর হবে’।

 

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বহাল নাকি তা পরিবর্তন করা উচিত বলে মনে করেন?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, জুলাই এবং আগস্টে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ জীবন দিয়েছে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে। এটি অন্য কোনোভাবে হয়নি যেমন ২০১৩-১৪ আন্দোলন বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে গিয়েছে, গুম করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে। জুলাইয়ে এরকম ঘটেনি। দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে। সে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের পলাতক সভানেত্রী শেখ হাসিনা বা তার ছেলে একাধিকবার গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। আমি কোনোদিন কোনো বক্তব্যে তারা অনুতপ্ত হয়েছেন বা ক্ষমা চেয়েছেন, দুঃখ প্রকাশ করেছেন এরকম কোনো কিছু আমার মনে হয়নি। সে আওয়ামী লীগ ফিরে আসার রাজনীতি স্বাভাবিকভাবে হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি না। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। আমি মনে করি প্রচলিত আইনে বিচার-বিশ্লেষণের পরই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

 

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে আপনার প্রত্যাশা কী?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমি তো ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছি। চব্বিশের ১৯ জুলাই কালভার্ট রোডে আমার দায়িত্ব ছিল, যেদিন প্রেস ক্লাবে বিএনপির প্রোগ্রাম ছিল—রুহুল কবির রিজভী আহমেদ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মানে কারফিউর আগের দিন। সেখানে আমার মিছিল থেকে মানে ছাত্রদলের মিছিল থেকে তিনজন শহীদ হয়েছেন। যারা এক-দুই সেকেন্ড আগের ছবিতে আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, পরের ছবিতে তারা সেখানে মারা গিয়েছে। আমাদের ঢাকা কলেজের ছাত্রদলের এখন বর্তমান মেম্বার সেক্রেটারি মিল্লাত খুবই বাজেভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, সে যে বেঁচে আছে তা অনেক। আমাদের ঢাকা মহানগরের ফখরুল, ঢাকা কলেজের ইমরান এখনো থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমাদের কনভিনিং কমিটির সদস্যরা সবাই আমার সঙ্গেই ছিলেন। গুলি করা হয়েছে এমন না যে—তাকে করেছে, আমাকে করেনি এমন নয়। নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করা হয়েছে। এর বাইরেও রামপুরাতে ছিলাম, সেখানে খুবই বাজেভাবে গুলি বর্ষণ হয়েছে, আশপাশের মানুষ মারা গিয়েছে। যারা জুলাই-আগস্টে রাজপথ থেকে বেঁচে গিছে তারা এমন নয় যে কোনো কৌশল করে বেঁচে গিয়েছে, ভাগ্যক্রমে। সংগঠনের শীর্ষ নেতা আমাদের রাকিবুল ইসলাম রাকিব হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি তো জানিই না যে এখানে কীভাবে আমরা বেঁচে গিয়েছি। সে সংগঠনের আমরা সে সময় দায়িত্ব পালন করেছি আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কোনো ক্রেডিট দেওয়া হয়নি, আমরা চাইওনি। সুতরাং, আমরা বেঁচে আছি, বিশেষ করে ১৯ জুলাইতে আমি যে বেঁচে গিয়েছি এটিই মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, আল্লাহ নিজ হাতে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

 

আমার ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রত্যাশাই নেই। আমরা দায়িত্ব পালন করেছি, আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন। এরকম একটা আন্দোলনে ছাত্রদলের মতো একটি বড় সংগঠন রাজপথে শক্তিশালীভাবে ছিল। আমাদের ১৪২ সহকর্মী মারা গিয়েছে, এটি কোনো সহজ কথা না। প্রতিদিন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শহীদ হতো, পরিবারের সঙ্গে কথা বলতাম, তাদের দাফনের ব্যবস্থা কোথায় কী হচ্ছে তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অভিহিত করে আবার রাজপথে যাওয়া, আবার পলিসি মেকিংয়ে কাজ করা—জুলাই-আগস্টে সব থেকে কঠিন ছিল আমাদের জন্য। বিশেষ করে আমি এবং আমার সভাপতির জন্য। আমরা সে সময় কাজ করেছি, আল্লাহর রহমতে দেশ এখন একটা গণতান্ত্রিক ধারায় আছে। ছাত্রদল কোনো ক্রেডিট দাবি করেনি, ক্রেডিট দেওয়াও হয়নি।

 

আমার মনে হয় না ৫ আগস্টের পরে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিষয়ে আমাদের দোষারোপ করা হয়েছে বা আমি নিজে খারাপ কোনো একটা বিষয়ে জড়িত হয়েছি। দোষ-ত্রুটি হয়েছে বক্তব্য-বিবৃতিতে, রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, এর বাইরে সবটাই ভালোভাবে থাকার চেষ্টা করেছি।

 

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার কার্যকালে সার্বিকভাবে ১০০ নম্বরের মধ্যে আপনি কত পাবেন বলে আশা করেন?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: না, এটা তো আমি বলতে পারব না। আমার পক্ষে তো আমাকে মার্ক দেওয়া সম্ভব না। তবে আমরা সৎভাবে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। আপনারা বা আমাদের নেতাকর্মীরা বা আমাদের সহকর্মী, অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এগুলো ভালো বলতে পারবে। আমরা দায়িত্ব পালন করেছি, দায়িত্ব শেষ আলহামদুলিল্লাহ। এখন আমরা বাড়তি সময়ে আছি, নতুনরা দায়িত্বে আসবে। এটি সবাই মিলে মূল্যায়ন করবে।

 

এশিয়া পোস্ট: এবারের নতুন কমিটিতে যদি পদ না পান তখন রাজনীতি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: যদি বড় ধরনের কোনো ক্রাইসিস না থাকে সাধারণত ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা পরবর্তীতে বিএনপিতে বেশ ভালোভাবে মূল্যায়িত হয়। এবার এমপি হয়েছেন, অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন এমন অনেকে রয়েছেন যারা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়ে দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দায়িত্বকালীন সময়ে অনেকদিন পড়াশোনা একটু কমই করা হয়েছে, স্বভাবত ইউরোপে বা আমেরিকাতে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনে পড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি আমার অনেক দিনের ইচ্ছা।

 

আর দলের নিকট তো আমাদের প্রোফাইল রয়েছে। দল যেখানে দেবে সেখানে দায়িত্ব পালন করব। আর ছাত্রদলের দায়িত্বে নতুন যারা আসবেন সবসময় তাদের জন্য সহযোগিতা থাকবে, পরামর্শ থাকবে। তবে আমার এলাকায় কাজ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমার আছে। যেহেতু আমার বাড়ি নোয়াখালী সদর ও সুবর্ণচর, এবারও সেখানে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আমার প্রস্তুতি ছিল, পরিকল্পনা ছিল। নিঃসন্দেহে একটা জায়গায় যাচ্ছি সেটি হচ্ছে এলাকায়। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা, এলাকায় কাজ করা, এখনও করছি। একই সঙ্গে দলেরও দায়িত্ব থাকতে হবে। আমি যেহেতু কেন্দ্রীয় রাজনীতি করি সেখানে দল যেখানে দায়িত্ব দেবে সেখানে কাজ করব।

 

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমি তো দীর্ঘ সময় ধরে এখানে কাজ করেছি। যারা নতুন নেতৃত্বে আসবেন, তারা আমাদের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা, সহকর্মী। যারাই পাইপলাইনে রয়েছেন, যেই সার্কেলে কমিটি হোক না কেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তাদের ভালো কাজ করার প্রচণ্ড সক্ষমতা রয়েছে, অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখন চলমান যে রাজনীতি চলছে, বিশেষ করে একটি ইতিবাচক শিক্ষাঙ্গনকে টার্গেট করে। প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদলকে আরও কীভাবে প্রসারিত করা যায়, সে বিষয়ে তারা খুব ভালো করবেন বলে আমি প্রত্যাশা রাখছি। যেটি আমরা সবসময় বলি যে, আমাদের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে খারাপ ফল হয়েছে, এটি যেরকম সত্য, একই সঙ্গে ছাত্রদলের ঘুরে দাঁড়িয়ে ভালো ফলাফল করার সক্ষমতা ইনশাআল্লাহ রয়েছে। তাদের কাজ করার অভিজ্ঞতা যেরকম রয়েছে এবং সক্ষমতাও রয়েছে। তারা ভালো করবেন ইনশাআল্লাহ।

 

এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী? বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই আশাবাদী এবং ইতিবাচক মানুষ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তো শপথ নিয়েছেন অল্প কিছুদিন হলো। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে লম্বা সময় কাজ করেছি। আমি মনে করি, তারেক রহমান প্রচণ্ড পরিশ্রমি মানুষ। তিনি যখন লন্ডনে ছিলেন তখনও বাংলাদেশের সঙ্গে তিনি ১৭-১৮ ঘণ্টা স্কাইপিতে কানেক্ট থাকতেন। একটা মানুষ লম্বা সময় ধরে শুধু দল ও দেশ নিয়ে কাজ করছেন ধৈর্য সহকারে। এটি না দেখলে মনে হবে বাড়িয়ে বলছি। বাংলাদেশ এগিয়ে নেওয়ার জন্য দেশের মানুষ যার হাতে দায়িত্ব দিয়েছে আমি মনে করি সব থেকে পারফেক্ট একজন মানুষের কাছে দিয়েছে। আমরা যদি তাকে সবাই সহযোগিতা করি, ইনশাআল্লাহ তিনি ভালো করবেন, দেশকে ভালো রাখতে পারবেন।

 

আমি মনে করি সংসদ যদি কার্যকর হয়, সরকারি ও বিরোধী দল ভূমিকা রাখলে আমরা স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারব। শুধু বিরোধিতার জন্য কেউ বিরোধিতা করবে না, প্রকৃত অর্থে সরকারকে সহযোগিতা করবে এবং বিরোধী দলকেও সরকার সহযোগিতা করলে আমি মনে করি ইনশাআল্লাহ দেশ ভালো চলবে এবং দেশের মানুষ ভালো থাকবে।

 

এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নেয়নি। সেক্ষেত্রে একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে জুলাই সনদ আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা আপনি কি শঙ্কায় আছেন?

 

নাছির উদ্দীন নাছির: না, কোনো সংশয় নেই। এটি এজন্যই সংশয় নেই কারণ এটি খুবই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। বিএনপি জুলাই সনদে যেই যেই বিষয়গুলোতে নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছে—আগে থেকে বলেছে যে আমরা এই এই বিষয়গুলোতে একমত নই—সেগুলো বাদ দিয়ে যেই যেই বিষয়গুলোতে স্বাক্ষর করেছে, প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। এটি তো আগে থেকেই আমরা জনগণকে বলে রেখেছি। জনগণ যদি সেটি পছন্দ না করত তাহলে তো জনগণ ভোট দিত না বা আস্থা রাখত না।