নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ
গত মাসে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন- ‘আমেরিকান সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো আমেরিকান নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়া’। তিনি ডেমোক্রেটদের দাঁড়িয়ে সমর্থন জানানোর চ্যালেঞ্জও দিয়েছিলেন, যদিও তারা বসেই ছিলেন। রাজনৈতিক নাটকীয়তা হিসেবে বিষয়টি হয়তো কার্যকর ছিল। কিন্তু জীবন-মরণ বাস্তবতায়, অর্থাৎ আমেরিকান নাগরিকদের প্রকৃত নিরাপত্তার প্রশ্নে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে মি. ট্রাম্পের হালকা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা লক্ষাধিক আমেরিকানকে বেপরোয়া ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অপ্রস্তুতি সত্যিই হতবাক করার মতো। কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা চলছিল, কূটনীতি ব্যর্থ হলে যুদ্ধ হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত ছিল দূতাবাসগুলোকে যথেষ্ট আগেভাগে সতর্ক করা এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়ম মেনে নিজেদের কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে বলা। বেসামরিকদের জন্য সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বার্তা হওয়া দরকার ছিল পরিষ্কার ও সময়োপযোগী এবং সাহায্য চাইতে হলে কী করতে হবে, সেটাও জানানো দরকার ছিল। কিন্তু তার বদলে ছিল বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি; বহু বেসামরিক মানুষকে নিজেদের মতো করে বাঁচার পথ খুঁজতে হয়েছে। এমনকি যখন মাঝারি পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারা টুইট করে লিখছিলেন ‘এখনই চলে যান’, তখনও ওই অঞ্চলের মাত্র দুটি মার্কিন দূতাবাসই প্রায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধ শুরুর আগের দিন পর্যন্ত কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার অনুমোদন দেয়নি- আর সেটাও শুধু ইসরাইল ও লেবাননের ক্ষেত্রে। অধিকাংশ দেশের জন্য বাধ্যতামূলক প্রস্থানের নির্দেশ যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ কয়েক দিন পর আসে। অথচ শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে চালানো সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি অনুমেয় ছিল। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, বিশেষ করে বিমানবন্দর ও হোটেলের মতো সহজ লক্ষ্যগুলোকে, মরিয়া হয়ে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এর মূল্য বাড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টায়।
ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কূটনীতিক বা নিজেদের নাগরিক- কাউকেই সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেনি, আবার যথাযথ সতর্কও করেনি। যখন সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ এল, তখনও তার সঙ্গে এ তথ্য ছিল না যে কীভাবে, বা আদৌ, মার্কিন সরকার তাদের সহায়তা করবে কি না। অতিরিক্তভাবে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়- যাতে তারাও নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে পারে, তাও খুবই সীমিত ছিল বলেই মনে হচ্ছে। বিদেশে থাকা আমেরিকানরা সতর্কবার্তা পায়নি; আমাদের অংশীদাররাও পায়নি।
একই সময়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, অঞ্চলজুড়ে আকাশপথ প্রায় অচল করে দেয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারসহ বিভিন্ন জায়গাকে লক্ষ্যবস্তু করা ইরানের প্রতিক্রিয়ার এই মাত্রা যুক্তরাষ্ট্র কল্পনাই করেনি। ঘটনাগুলো এভাবে ঘটতেই হবে- এমন কোনো কথা ছিল না। আমরা দুজন সংকটকালে বিদেশে আমেরিকানদের জীবন কীভাবে রক্ষা করতে হয়, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রাখি। ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ নামের যোদ্ধা গোষ্ঠী ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিলে এমনটাই ঘটেছিল। তখন যথাক্রমে লেবাননে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং পেন্টাগনের লেভান্ট পরিচালক হিসেবে আমরা দ্রুত সাড়া দিয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তখনকার সবচেয়ে বড় যোদ্ধা নন এমন আমেরিকান সরিয়ে নেয়ার অভিযান সংগঠিত করেছিলাম।
চ্যালেঞ্জ ছিল ভয়াবহ। কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই বৈরুতে মার্কিন দূতাবাস হঠাৎ করেই সামনের সারিতে চলে গিয়েছিল। ইসরাইল বিমানবন্দরের রানওয়েতে গর্ত করে দেয়, সমুদ্রবন্দর অবরুদ্ধ করে এবং সিরিয়ায় যাওয়ার পথগুলো ধ্বংস করে। সন্দেহজনক মনে হওয়া যানবাহনে বিমান হামলা চালানো হচ্ছিল। লেবানন থেকে বের হওয়ার সব বাণিজ্যিক পথ হয় বন্ধ ছিল, নয়তো বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল।
দূতাবাস চত্বরে থাকা একটি হেলিপ্যাড ছাড়া- যেখান থেকে অল্প কিছু মানুষকে সাইপ্রাসে নেয়া যেত, তা ছাড়া লেবাননে অপেক্ষমাণ আমেরিকানদের সরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের কাছে কোনো সামরিক সম্পদই সেখানে মোতায়েন ছিল না। তারা দূতাবাসের ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে নিজেদের সরকারের সাহায্যের জন্য তাকিয়ে ছিল।
শুরুর সেই দমফাটা ব্যস্ত দিনগুলোতে হোয়াইট হাউস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন এবং তিনটি সামরিক কমান্ডের পেশাদাররা দূতাবাসের সঙ্গে দিনরাত কাজ করেছেন সরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টায়। সবচেয়ে কাছের সেনারা তখন জর্ডানে একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছিল। তারা সেই একই ব্যাটালিয়নের মেরিন সদস্য, যারা ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছিল। ইতিহাসটা ছিল বেদনাদায়ক। ২৩ বছর আগে যে জায়গায় সেই ভয়াবহ হামলা হয়েছিল, সেখানে আবার এই ইউনিটগুলোকে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে পেন্টাগনে অনেক বিতর্ক হয়েছিল। তবু ডাকা হলে তারা দ্রুত লেবাননে ছুটে যায় নিজেদের সহ-নাগরিকদের সরিয়ে নিতে সহায়তা করতে।
কনসুলার কর্মকর্তারা নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথি যাচাই ও হালনাগাদ করেন, ফোন-ব্যাংক তৈরি করেন এবং উদ্বিগ্ন আমেরিকান নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার অগ্রগতি জানাতে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দূতাবাস এবং সামরিক কর্মকর্তারা সমন্বয় করে নিশ্চিত করেন, যেন ইসরাইলি হামলা আমাদের সরিয়ে নেয়ার পথের সঙ্গে সংঘর্ষে না আসে। অভিযান শুরু হওয়ার পর আমরা এক মাসেরও কম সময়ে প্রায় ১৫ হাজার আমেরিকান নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিলাম।
এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে সেই তৎপরতার তুলনা করুন। বৈরুতের মার্কিন দূতাবাস এখন অঞ্চলটির কয়েকটি দূতাবাসের একটি, যেগুলো দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এবং কনসুলার সেবা স্থগিত করেছে। এটা করেছে ঠিক তখন, যখন এসব সেবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পর এবং ইরান যুদ্ধের তৃতীয় দিনে এসে, ট্রাম্প প্রশাসন ১৪টি দেশে থাকা আমেরিকান নাগরিকদের নিজ দায়িত্বে চলে যেতে বলেছে- বাণিজ্যিক পরিবহনে, যা বন্ধ আকাশসীমার কারণে মূলত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।
অনেক দূতাবাসে স্বাগতিক দেশের সঙ্গে যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করার মতো নিশ্চিত রাষ্ট্রদূতও নেই। স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের শূন্যতা ২০০৬ সালের তুলনায় এখন বড় ফাঁক তৈরি করেছে, যখন আমাদের হাতে ছিল অভিজ্ঞ বেসামরিক-সামরিক নেটওয়ার্ক। যুদ্ধের চতুর্থ দিন, মঙ্গলবার পর্যন্ত স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্বীকারই করেনি যে, সরকারকে হয়তো সরিয়ে নেয়ার কাজে সহায়তা করতে হতে পারে।
এর অনেক কিছুই এড়ানো যেত। প্রশাসন যদি দাবি করে যে, তারা ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা অনুমান করতে পারেনি, তবে তা ইচ্ছাকৃত সম্ভবত সচেতনভাবেই-অজ্ঞতা প্রদর্শনের শামিল। ২০০৬ সালে লেবাননে আমরা যে আগাম সতর্কতা পাইনি, তার সুবিধা এবার ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে ছিল। তারা বিকল্প পরিকল্পনা করতে পারত এবং নীরবে আর্থিক ও চুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারত। যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও অন্যান্য পরিবহন দ্রুত ভাড়া করে আমেরিকান নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া যায়।
সত্যি কথা বলতে, এই সরিয়ে নেয়ার কাজ আমাদের লেবাননের অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এখানে সম্ভাব্য সরিয়ে নেয়ার মানুষের সংখ্যা ১৫ হাজার নয়, কয়েক লাখ। যাত্রার দেশ একটি নয়, ১৪টি। আর ইরানের সঙ্গে সরিয়ে নেয়ার পথ নিয়ে সমন্বয় করার সক্ষমতাও যেন নেই। কিন্তু এটাই পরিকল্পনার অভাবকে আরও বেশি অবিশ্বাস্য করে তোলে।
ইরানি শাসনব্যবস্থা যতই জঘন্য হোক না কেন- নিজেদের জনগণের ওপর তাদের নির্মম দমনপীড়ন, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীলতামূলক আঞ্চলিক ভূমিকা এবং তাদের পারমাণবিক আকাক্সক্ষা সত্ত্বেও তারা আমেরিকান জনগণের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। কিন্তু মি. ট্রাম্পের যুদ্ধ অঞ্চলটিতে থাকা আমেরিকান বেসামরিক নাগরিকদের জন্য তাৎক্ষণিক ও তীব্র ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রশাসন যখন এই যুদ্ধের পরিকল্পনা শুরু করেছিল, তখনই তাদের আমেরিকানদের সুরক্ষার পরিকল্পনাও করা উচিত ছিল। যেটিকে প্রেসিডেন্ট নিজেই ‘আমেরিকান সরকারের প্রথম দায়িত্ব’ বলেছিলেন।
(লেখক জেফ্রি ফেল্টম্যান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। মারা কারলিন সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ২০০৬ ও ২০০৭ সালে পেন্টাগনে লেভান্ট পরিচালক ছিলেন। তারা দ’ুজনই বর্তমানে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো। তাদের এই লেখাটি অনলাইন নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ)