Image description

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি উৎস এই শ্রমবাজার। সেই যাত্রায় পুরুষদের পাশাপাশি হাজারো নারী বিদেশে কাজ করতে গেছেন—অধিকাংশই গৃহকর্মী হিসেবে। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে তারা দেশ ছাড়েন, বাস্তবের অনেক গল্পই শেষ হয় নির্যাতন, অপমান, কিংবা নীরব মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে দাঁড়ায়—দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই নারীরা কি সত্যিই সুরক্ষিত?

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহু আগেই লিখেছিলেন—“এই পৃথিবীতে যাহা কিছু চির সুন্দর, কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে নারী পৃথিবীর সৌন্দর্যের অর্ধেক নির্মাণ করে, সেই নারীই আজ অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, সবচেয়ে বেশি অসুরক্ষিত।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের বিদেশ যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। শুরুতে সংখ্যা ছিল কয়েক হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ২০০৪ সালের পর নারী অভিবাসন ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে।

২০১৩ সালে প্রথমবার বছরে ৫০ হাজার নারী বিদেশে যান। আর ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তির পর এই সংখ্যা দ্রুত এক লাখ অতিক্রম করে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন। সে সময় মোট শ্রম অভিবাসনের প্রায় ১৬ শতাংশই ছিলেন নারী। করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ২০২২ সালে আবারও নারী অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জনে। কিন্তু এরপর থেকেই ছবিটা বদলাতে শুরু করে। ২০২৫ সালে বিদেশে গেছেন মাত্র ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী—মোট অভিবাসীর মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালের তুলনায় এটি প্রায় ৪১ শতাংশ কম। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পতন নয়। এটি আস্থার পতন।

অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) বলছে, বিদেশে নিরাপদ কর্মপরিবেশের অনিশ্চয়তা এবং গৃহের ভেতরে সংঘটিত সহিংসতা নারী অভিবাসনকে ক্রমেই নিরুৎসাহিত করছে।

বিদেশে গিয়ে নারীরা মূলত তিন ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হন। প্রথমত, অর্থনৈতিক শোষণ। চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজ করানো, কিংবা একাধিক বাড়িতে কাজ করতে বাধ্য করা—এসব অভিযোগ খুবই সাধারণ।

দ্বিতীয়ত, শারীরিক নির্যাতন। কাজের চাপ বা সামান্য ভুলের কারণে মারধর, অপমান—এসব যেন অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে ভয়াবহ—যৌন নির্যাতন।

এই নির্যাতনের বহু ঘটনা কখনোই প্রকাশ পায় না। কারণ ভয়, সামাজিক অপবাদ এবং আইনি জটিলতার কারণে অনেক নারীই নীরব থাকেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। মৃত্যুর সনদে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখা থাকে—আত্মহত্যা। কিন্তু পরিবারগুলো বলছে, মরদেহে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। প্রশ্ন উঠছে—যে নারী পরিবার চালাতে জীবন বাজি রেখে বিদেশে যায়, সে কি এত সহজে আত্মহত্যা করে? নাকি সেই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে থাকে নির্যাতনের অন্ধকার ইতিহাস?
হাজারো নারীর নীরব প্রত্যাবর্তন: বিদেশ থেকে কতজন নারী দেশে ফিরেছেন তার নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হয় গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। শুধু করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালেই দেশে ফিরে আসেন ৪৯ হাজার ২২ জন নারী। ২০১৯ সালে বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে দেশে ফিরেছিলেন ৩ হাজার ১৪৪ নারী। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত। শুধু সৌদি আরব থেকেই ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি নারী দেশে ফিরে এসেছেন। এই প্রত্যাবর্তনের অনেক গল্পই নীরব—কারণ সমাজে ফিরে এসে অনেকেই আর কথা বলতে চান না।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এই খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। বিদেশে পাঠানোর আগে সঠিক প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রত্যেক নারী শ্রমিকের কাছে মোবাইল ফোন থাকা, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ এবং বিপদে পড়লে দ্রুত দূতাবাসের সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নির্যাতনের অভিযোগ এলে সেটির সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা। কারণ বিচারহীনতা অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে।

দক্ষিণ এশিয়ার নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, “উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত হয়েছে।”

বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের বাস্তবতা সেই মানদণ্ডে আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে। নারী অভিবাসন কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়—এটি মানবাধিকারের বিষয়, মর্যাদার বিষয়। যে নারী নিজের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে যায়, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ একজন নারী শ্রমিকের কান্না শুধু একজন মানুষের কান্না নয়—তা একটি পরিবারের, একটি সমাজের, শেষ পর্যন্ত একটি দেশের কান্না।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাই প্রতিশ্রুতিটা নতুন করে উচ্চারণ করা দরকার—নারী যেন আর ভাগ্য বদলাতে গিয়ে নিজের জীবন হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।

লেখক: নিয়াজ মাহমুদ,সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট