ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে ‘এপস্টেইন ফাইল’ ইস্যু বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, তা এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন–সংক্রান্ত কিছু নথি প্রকাশ করলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ওই নথিতে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ওই ঘটনায় যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের সাবেক সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর এবং যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের নাম আলোচনায় আসে। তাদের গ্রেফতারের ঘটনা দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের ওপরও চাপ তৈরি করে।
এ ছাড়া ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে অভিযোগও ওঠে, যেখানে তাকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ তোলা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের বিরুদ্ধেও এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হয়েছেন বলে তদন্ত কমিটির প্রধান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন গত সপ্তাহে আইনপ্রণেতাদের কাছে গোপন শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় তিনি এমন কিছু দেখেননি যা তাকে উদ্বিগ্ন করেছিল। একই কমিটির সামনে এর আগের দিন সাক্ষ্য দেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও।
তবে ইরানে বোমা হামলা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি গত বছর কংগ্রেসে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাসের উদ্যোগে ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কোনো দেশে বোমা হামলা চালালেই এপস্টেইন ফাইলের বিষয়টি হারিয়ে যাবে না।’ তিনি ইরান যুদ্ধেরও সমালোচনা করেছেন।
অ্যাটলাস গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের বিশ্লেষক এবং সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক শাইয়েল বেন-এফ্রাইম বলেন, ইরানের ওপর হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বর্তমানে তার মেয়াদের মধ্যে সবচেয়ে নিচের দিকে রয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও দেখা যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের মতো বড় ইস্যু জনমতের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
বেন-এফ্রাইম বলেন, গুগলে এপস্টেইন ফাইল নিয়ে যে পরিমাণ খোঁজ করা হচ্ছিল, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা হঠাৎ কমে গেছে। অন্তত সাময়িকভাবে হলেও এই যুদ্ধ কংগ্রেস ও গণমাধ্যমের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও হয়তো এই যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইসরায়েলে আগামী জুনের মধ্যেই নির্বাচন হতে পারে।
বেন-এফ্রাইমের মতে, গাজায় চলমান যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা খুব একটা বাড়াতে পারেনি। তার ভাষায়, হামাস তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষ হওয়ায় সেখানে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়নি। বিপরীতে, ইরানকে ‘আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখানো সহজ।
সূত্র: আল-জাজিরা