ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে। ইরানে হামলার পর এমনটাই বলছেন যুদ্ধ বিষয়ক বিশ্লেষকরা। ইসরাইলে নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে। এ সময় ইরানের সাথে যুদ্ধ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে একটি সুযোগ দিয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই যুদ্ধ থেকে তিনি রাজনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হবেন তা নির্ভর করবে সংঘাতটি কীভাবে অগ্রসর হয় এবং কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার একদিন পর নেতানিয়াহু বলেন, ওয়াশিংটনের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই ইসরাইল ‘সন্ত্রাসী শাসনকে সিদ্ধান্তমূলকভাবে আঘাত করতে ৪০ বছর ধরে যা করতে চেয়েছি, তা করতে পেরেছে।’
গাজা যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তাকে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দিনের হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
৭৬ বছর বয়সী ডানপন্থী লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহু ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মেয়াদ মিলিয়ে ১৮ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় তিনি। রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ক্ষমতার জন্য পরিচিত নেতানিয়াহু গত গ্রীষ্ম থেকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই ক্ষমতায় আছেন। কারণ তার অতিরক্ষণশীল ধর্মীয় মিত্রদের সাথে সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের ওপর তাকে ক্ষমা করার জন্য চাপ দিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৭ অক্টোবরের মধ্যে ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমানুয়েল নাভনের মতে, নেতানিয়াহু আগাম নির্বাচন ডাকতে পারেন। তার ভাষায়, ‘এটা স্পষ্ট। তিনি অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের হামলার বার্ষিকী সামনে থাকায়। গাজা হামলার পর নেতানিয়াহু একেবারে তলানিতে নেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।’
জনমত জরিপ অনুযায়ী, যদি এখন নির্বাচন হয় তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি এগিয়ে থাকবে। তাতে সম্ভবত তাকে আবার সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়া হবে, যদিও বর্তমান মিত্রদের নিয়ে তার এখনো সংসদে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় কোনো সামরিক বিজয় হলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে।
নিরপেক্ষ ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল হোরোভিৎস বলেন, এই আক্রমণ নিঃসন্দেহে সেই ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করছে, যা নেতানিয়াহু তৈরি করতে চান। তার ‘পূর্ণ বিজয়’ স্লোগানের সাথে সম্পর্কিত ভাবমূর্তি। তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু দেখাতে চান যে এটি শুধু নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং বাস্তবতা। এটি তার জাতীয় কর্মসূচি এবং নির্বাচনী কৌশল।
চ্যানেল ১৩ টেলিভিশনের প্রখ্যাত সাংবাদিক রাভিভ দ্রুকার বলেন, নেতানিয়াহু মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছে, যদিও সেটি বাস্তবে ভ্রম হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, হামাস এখনও গাজা পরিচালনা করছে, আর শনিবারের হামলার পরও ইরান এখনও ইরানই রয়ে গেছে।
জনপ্রিয় সংবাদ ওয়েবসাইট ওয়ালায় সাংবাদিক উরিয়েল ডেস্কাল আরও এগিয়ে গিয়ে বলেন, নেতানিয়াহু হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংঘাতের সময় নির্বাচন করেছেন, যাতে জরুরি অবস্থার কারণে ৩০ মার্চের বাজেট পাসের সময়সীমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিছিয়ে যায়, যেখানে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হচ্ছিল। যদি বাজেট পাস না হয়, তাহলে ১লা এপ্রিল সরকার ভেঙে যাবে এবং নির্বাচন ঘোষণা করতে হবে। সেই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু দুর্বল অবস্থান থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে বাধ্য হতেন। কিন্তু নাভনের মতে, যদি ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ ইসরাইলের জন্য সফল হয়, তাহলে তা নেতানিয়াহুর জন্য একটি রাজনৈতিক বিজয় হবে। তবে যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন হোরোভিৎস। তার মতে, বহু হতাহতের দীর্ঘ যুদ্ধ এবং উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ- এই দুইয়ের প্রতি জনসাধারণের সহনশীলতা খুবই কম।
গত জুনে যুদ্ধ চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলে ৩০ জন নিহত হয়। আর শনিবারের পর থেকে ইরানের পাল্টা হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছে। হোরোভিৎস বলেন, ইসরাইলের সাফল্যের কৃতিত্ব মূলত সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষের দৃঢ়তার জন্য দেয়া হয়, যারা দেশের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম করেছে। তিনি যোগ করেন, জনপ্রিয়তা বাড়ছে সেনাবাহিনীর, অবশ্যই নেতানিয়াহুর নয়।