Image description

মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক সংকট বাড়ছে। ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন শুধু তেহরানে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন পুরো অঞ্চলকে তাতিয়ে তুলেছে।

বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন স্থাপনা, দূতাবাস ও ঘাঁটিগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে তেহরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এসব দেশ থেকে নিজ নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর অর্থ ইরানে হামলার তীব্রতা বাড়ানোর চিন্তা করছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রেক্ষিতে অন্য দেশগুলোতে ইরানের হামলা জোরদার করার শঙ্কা করছে মার্কিন প্রশাসন।

মঙ্গলবার সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও জর্ডানের মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কঠোর হামলা হয়েছে। এতে রিয়াদ, জেদ্দা, কাতার ও কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি দেশের ভিসা সেবা স্থগিত করা হয়েছে। নাগরিকদের দূতাবাস এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের এমন হামলার কঠোর জবাব দেয়ার কথা জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর সংস্থা গাল্‌ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি। হামলা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধে সক্রিয় হওয়ার হুমকি দিয়েছে দেশগুলো।

চতুর্থ দিনে ইরানে হামলার মাত্রা আরও বেড়েছে। তেহরানসহ কারাজ ও কোমে প্রথম দুইদিনের তুলনায় বোমা বর্ষণের শব্দ বেশি শোনা গেছে। নিহত ৭৫০ ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলা গত জুনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এতে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৪ দেশ থেকে নিজ নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশকে চরম সতর্কতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই নির্দেশ জারির অর্থ হচ্ছে ভয়াবহ। ইরানে হামলার ধরন পরিবর্তন হতে পারে। এদিকে এই সংঘাতের ফলে আকাশপথে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইসরাইল, কাতার, ইরান ও ইরাকের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যা সংকটককে আরও ঘনীভূত করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে এই সংঘাত ভুরাজনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ পাল্টে দিচ্ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের তাপ ইউরোপের দেশগুলোতেও পৌঁছে গেছে। সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যদিও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার জানিয়েছেন তারা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না। তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সাইপ্রাসে অবস্থিত বৃটিশ আরএএফ অ্যাক্রোটিরি ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাইপ্রাসে হামলার পর সেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর কথা জানিয়েছে ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে জার্মানি। দেশটি সামরিক সহযোগিতা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার ভাষায়, যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চলবে না, সম্ভবত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধ দ্রুত ও সিদ্ধান্তমূলক হতে পারে, যদিও কিছুটা সময় লাগতে পারে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি অনলাইন ব্রিফিংয়ে জানান, সামরিক অভিযানের সাধারণ সময়সীমা কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সময়সীমা বদলাতে পারে। ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা কম বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে বলে ধারণা দিলেও পরে দীর্ঘ সময়সীমার ইঙ্গিত দেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও উৎপাদন ধ্বংস করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। যা স্থলযুদ্ধ ছাড়াই অর্জন সম্ভব বলে তাদের বিশ্বাস। সংঘাত ইতিমধ্যে আঞ্চলিক পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে। ইসরাইল তেহরানে রাষ্ট্রীয় সমপ্রচার কেন্দ্র আইআরআইবি’র কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ’র অবস্থানেও আঘাত করেছে। তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় বিস্ফোরণে ভবন কেঁপে ওঠে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে।

ইরানকে উপসাগরীয় দেশগুলোর কঠোর বার্তা: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলায় নিজেদের ঐক্য আরও সুসংহত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত রোববার উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্য দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমান একটি জরুরি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করে। বৈঠকে তারা জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে নিজেদের রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে দেয় এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে সম্মিলিত আত্মরক্ষার প্রস্তুতি ঘোষণা করে। তেহরানের প্রতি জিসিসি’র বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা জানিয়েছে, ইরানের এই হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার ঐক্যকে কেবল আরও শক্তিশালীই করেছে। সংস্থাটি জানায়, এভাবে হামলা অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি কেবল একটি প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের ঝুঁকি তৈরি করবে। ইতিমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক আকাশসীমায় নজরদারি বিমান সক্রিয় করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন সামনে দু’টি কঠিন পথ খোলা- হয় পাল্টা জবাব দিয়ে এক বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি নেয়া, অথবা বারবার হামলার মুখে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা হারানোর বিষয়টি মেনে নেয়া। উপসাগরীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে তেহরানকে বার্তা পাঠিয়েছে যে, পরবর্তী কোনো হামলার জন্য ইসলামিক রিপাবলিককে আরও ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।

ইরানে নিহত বেড়ে ৭৮৭: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানে নিহত বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার ইরানের রেড ক্রিসেন্ট এ তথ্য জানিয়েছে। দেশটির রাজধানী তেহরানে সোমবার দিবাগত রাত থেকে দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত কয়েক রাতের তুলনায় সোমবার দিবাগত রাতের এই বোমাবর্ষণ ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের একটি ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি কমপ্লেক্সেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে টেলিভিশনটির সমপ্রচার এখনো চালু রয়েছে। কেবল তেহরানই নয়, কারাজ ও কোমসহ ইরানের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও ব্যাপক বোমাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে হামলা: ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান বাহিনী ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) টেলিগ্রামে দেয়া বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনের ওপর বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ হামলার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আমিরাতে ইরানের হামলার পরিসংখ্যান: সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আমিরাত জুড়ে ইরানের চালানো হামলায় এ পর্যন্ত ৩ জন নিহত ও ৬৮ জন আহত হয়েছেন। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ইরান থেকে আমিরাত লক্ষ্য করে এ পর্যন্ত ১৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ড্রোন ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭২টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে এবং ১৩টি সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র আমিরাতের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। ইরান থেকে আমিরাত লক্ষ্য করে মোট ৮১২টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। আমিরাত ৭৫৫টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।

সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসে হামলা: সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায় ইরান। এতে সৌদি আরবের বিভিন্ন মিশনে সব সেবা বাতিল করা হয়েছে। দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের সমস্ত নিয়মিত ও জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল এবং জেদ্দা, রিয়াদ ও দাহরামের মিশনগুলোতে ‘শেল্টার ইন প্লেস’ নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সংস্থার ওপর হামলার কারণে আগামী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত দূতাবাসের কাছাকাছি যাবেন না। দূতাবাস আমেরিকান নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা বজায় রাখার পরামর্শও দিয়েছে। উল্লেখ্য, আক্রান্ত হওয়ার পর সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সর্ববৃহৎ তেল প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোতে আগুন ধরে যায়।

ইরানের ওপর সংঘাত ‘চাপিয়ে দেয়া হয়েছে’: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জায়নবাদকে মুসলিম বিশ্বে অস্থিতিশীলতার প্রধান চালিকাশক্তি এবং মানবতার জন্য হুমকি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ পাকিস্তানের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বের ওপর যে প্রতিটি বিপর্যয় নেমে এসেছে, যে প্রতিটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে- সেগুলোর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জায়নবাদী মতাদর্শ ও রাষ্ট্রের হাত রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে বহিঃশত্রুর হুমকির বিরুদ্ধে একটি ঢাল হিসেবে উল্লেখ করেন। খাজা আসিফ আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সংঘাতটি তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।