ইরানের রাজধানী তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটে অবস্থিত দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়। সেখানেই তাকে হত্যা করতে শনিবার সকালে পর পর ৩০টির মতো বোমা নির্ভুলভাবে নিক্ষেপ করে ইসরায়েল। যদিও এখন পর্যন্ত তার মরদেহ সনাক্ত কিংবা সেসময় কার্যালয়ে কতজন ছিলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি ইরান। তবে তাকে হত্যা করতে তেল আবিব কয়েক দশক ধরে নকশা এঁকেছে, তা অকপটে স্বীকার করেছে দেশটি। সঙ্গে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)।
কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় পাস্তুর স্ট্রিটসহ তেহরানে বসানো সমস্ত ট্র্যাফিক ক্যামেরা হ্যাক করেছিল ইসরায়েল। আর এই ক্যামেরাগুলোই ছিল এই কিলিং মিশনের অন্যতম সোর্স। এ সম্পর্কে জানেন, এমন দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। সংবাদমাধ্যমটিকে তারা জানায়, কীভাবে খামেনিকে ট্র্যাক করে হত্যা করে ইসরায়েল।
তাদের ভাষ্য, তেহরানের প্রায় সব ট্রাফিক ক্যামেরা বছরের পর বছর ধরে হ্যাক করা ছিল। সেখানকার ভিডিওচিত্র এনক্রিপ্ট করে তেল আবিব ও দক্ষিণ ইসরায়েলের সার্ভারে পাঠানো হতো। একটি নির্দিষ্ট ক্যামেরার কোণ বিশেষভাবে কার্যকর ছিল। সেটি দেখে নিরাপত্তারক্ষীরা কোথায় ব্যক্তিগত গাড়ি রাখেন এবং সুরক্ষিত প্রাঙ্গণের কোন অংশে কীভাবে চলাচল করেন, তা বোঝা যেত।
জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এসব নিরাপত্তাকর্মীর ঠিকানা, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি, কর্মস্থলে যাওয়ার পথ এবং কাদের নিরাপত্তায় তারা নিয়োজিত—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা একে বলেন ‘প্যাটার্ন অব লাইফ’ বিশ্লেষণ। অর্থাৎ ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উচ্চ প্রশিক্ষিত ও অনুগত দেহরক্ষী এবং গাড়িচালকদের পাস্তুর স্ট্রিটে গতিবিধি নজরে রাখছিল ইসরায়েল ও সিআইএ’র গোয়েন্দারা।
সূত্রগুলো জানায়, এ সক্ষমতাগুলো ছিল বহু বছর ধরে চলা এক গোপন গোয়েন্দা অভিযানের অংশ, যা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে লক্ষ্য করে হামলার পথ তৈরি করে। রিয়েল-টাইম তথ্যের এই উৎস ছিল শত শত গোয়েন্দা তথ্যের একটি মাত্র ধারা। এর পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও তথ্য নিয়ে ওই শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি কখন কার্যালয়ে থাকবেন এবং কারা তার সঙ্গে থাকবেন, তা নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া পাস্তুর স্ট্রিটের আশপাশের একাধিক মোবাইল ফোন টাওয়ারের কিছু যন্ত্রাংশ অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এতে ফোনে কল করলে তা ব্যস্ত দেখাত এবং খামেনির নিরাপত্তা বিভাগ দ্রুত সতর্কবার্তা দিতে পারেনি।
বোমা হামলার অনেক আগেই তেহরান সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা তৈরি করেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। বর্তমানে কর্মরত এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তেহরানকে জেরুজালেমের মতোই চিনতাম। আপনি যখন কোনো জায়গাকে নিজের বেড়ে ওঠার রাস্তার মতো চিনবেন, তখন সামান্য অস্বাভাবিকতাও চোখ এড়ায় না।’
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজধানীকে ঘিরে এই বিস্তৃত গোয়েন্দা চিত্র তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। এতে ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েলের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ‘ইউনিট ৮২০০’, মোসাদ এবং সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া বিপুল তথ্য প্রতিদিন বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী করে তোলা হতো।
সূত্রের ভাষ্য, ইসরায়েল ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস’ নামে একটি গাণিতিক পদ্ধতিতে কোটি কোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে। এর মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তকেন্দ্র শনাক্ত করা হয় এবং নজরদারি বা হামলার জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি এক ধরনের ‘টার্গেট তৈরির কারখানা’ হিসেবে কাজ করে।
ইসরায়েলি সামরিক রিজার্ভের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন (২৫ বছর) কর্মরত ইতাই শাপিরা বলেন, ‘ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্কৃতিতে লক্ষ্যভিত্তিক তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত যদি হয় কাউকে হত্যা করা হবে, তবে সিস্টেম হলো আমরা সেই লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য সরবরাহ করব।’
ইসরায়েল অতীতে দেশের বাইরে শত শত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এদের মধ্যে ছিলেন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতা, পরমাণু বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তারা। তবে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাকে হত্যার পরও এই দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল কতটা কৌশলগত সাফল্য বয়ে এনেছে, তা নিয়ে দেশটির ভেতরে ও বাইরে বিতর্ক রয়েছে।
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে এই গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রকাশ ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ওই সময় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ, স্বল্পপাল্লার ড্রোন এবং দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়। এতে রাশিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের রাডারও ধ্বংস হয় বলে দাবি করা হয়।

এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা প্রথমে তাদের চোখ বন্ধ করে দিয়েছিলাম’। তার দাবি, জুনের যুদ্ধের মতো সাম্প্রতিক অভিযানে ইসরায়েলি পাইলটরা ‘স্প্যারো’ নামের বিশেষ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেন। এর বিভিন্ন সংস্করণ এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে ছোট লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে সক্ষম, যা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের বাইরে।
সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারির অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভবিষ্যত অভিযান ও গোয়েন্দা সক্ষমতা সুরক্ষিত রাখতে কিছু তথ্য কখনোই প্রকাশ নাও করা হতে পারে। তবে এই প্রতিবেদনের জন্য কথা বলা বর্তমান ও সাবেক একাধিক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও ছিল।
সূত্রগুলোর দাবি, যখন সিআইএ ও ইসরায়েলি পক্ষ নিশ্চিত হয় যে, শনিবার সকালে খামেনি পাস্তুর স্ট্রিটের কাছে তার কার্যালয়ে বৈঠকে থাকবেন, তখন এটাকে তারা একটি ‘উপযুক্ত সুযোগ’ হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের মূল্যায়ন ছিল, যুদ্ধ পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ সেক্ষেত্রে তারা দ্রুত আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে সরে যেতে পারেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনি নাকি আত্মগোপনে থাকতে রাজি ছিলেন না। তার মিত্র ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ দীর্ঘ সময় ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করে একাধিক হামলা এড়িয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বৈরুতে তার অবস্থান লক্ষ্য করে ৮০টিরও বেশি বোমা ফেলে তাকে হত্যা করে ইসরায়েল।
তবে প্রকাশ্যেই তাকে হত্যা করা হতে পারে এমন সম্ভাবনাকে খামেনি অগ্রাহ্য করেছিলেন বলে ইরান–বিশেষজ্ঞদের অনেকে উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, তিনি নিজের জীবনকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভাগ্যের তুলনায় ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না; কেউ কেউ এমনও বলেন, তিনি শহীদ হওয়ার প্রত্যাশা পোষণ করতেন।
যুদ্ধ চলাকালে অবশ্য তিনি কিছু সতর্কতা নিয়েছিলেন বলে এক সূত্র জানায়। ওই ব্যক্তির ভাষ্য, ‘খামেনির জন্য দুটি বাঙ্কার নির্ধারিত ছিল। তিনি যদি বাঙ্কারে থাকতেন, তাহলে ইসরায়েলের বোমা কোনোভাবেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না।’
২০২৫ সালের জুনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চলার সময়ও ইসরায়েল সরাসরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। সে সময় তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নেতৃত্ব, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও মজুত ভান্ডার, পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানে হামলার হুমকি দেন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেন। যদিও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল এবং তা এ সপ্তাহেও অব্যাহত থাকার কথা ছিল। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা ওমান জানিয়েছিল, যুদ্ধ এড়াতে ইরান কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত এবং গত বৃহস্পতিবারের বৈঠককে তারা ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করে।
তবে প্রকাশ্যে ট্রাম্প আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, ব্যক্তিগত আলোচনায় তিনি ইরানের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট ছিলেন না, যা শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথ প্রশস্ত করে। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত আরেকজন জানান, ইরানে হামলার পরিকল্পনা কয়েক মাস ধরেই প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শনিবার সকালে খামেনি ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তেহরানে নির্দিষ্ট প্রাঙ্গণে বৈঠক করবেন—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অভিযান সমন্বয় করে।
একসময় পৃথক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা ছিল সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া; এতে সরাসরি নজরদারি ও ভুয়া তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যালগরিদমনির্ভর বিশাল ডেটা সংগ্রহ ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াকে অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে খামেনির মতো ‘উচ্চমূল্যের’ লক্ষ্যবস্তুর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সুযোগ ছিল না। ইসরায়েলি সামরিক নীতিমালা অনুযায়ী, দুজন পৃথক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেন যে লক্ষ্য ব্যক্তি নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত এবং তার সঙ্গে কারা রয়েছেন।
এ ঘটনায় ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের হাতে ছিল সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য, যার মধ্যে হ্যাক করা ট্রাফিক ক্যামেরা ও মোবাইল নেটওয়ার্কে প্রবেশের তথ্যও ছিল। সূত্রের দাবি, এসব তথ্যেই নিশ্চিত হয় যে নির্ধারিত সময়েই বৈঠকটি হচ্ছে এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও নির্দিষ্ট তথ্য ছিল বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, একটি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যও এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সিআইএ।
শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৩৮ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে টেক্সাসের উদ্দেশে রওনা হয়ে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানের ওপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন হামলা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ডেন কেইন বলেন, সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের ‘নজরদারি, যোগাযোগ ও প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা ব্যাহত, দুর্বল ও অন্ধ করে’ দেওয়া হয়। এতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় প্রাঙ্গণে হামলা চালাতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের জন্য পথ পরিষ্কার হয়। তার ভাষ্য, মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তায় ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি ‘ট্রিগার ইভেন্ট’ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল, যার ভিত্তিতে দিনের আলোতে ওই কম্পাউন্ডে হামলা চালানো হয়।
একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা আকাশে থাকার পর ইসরায়েলি বিমানগুলো খামেনির কমপ্লেক্সে প্রায় ৩০টি বোমা নির্ভুলভাবে নিক্ষেপ করে। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘ইরানিরা যখন সকালের নাস্তার জন্য ব্যস্ত ছিল, তখনই তাদের হত্যা করা হয়।’
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, দিনের আলোতে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত তাদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। তাদের বক্তব্য, ‘রাতের পরিবর্তে সকালে হামলা চালানোয়, ইরানের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল দ্বিতীয়বারের মতো কৌশলগত চমক অর্জন করতে পেরেছে।’
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইন বলেন, এই কৌশলগত সাফল্য দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল। তার মতে, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন মোসাদের প্রধান মীর দাগানকে ইরানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন। শাইনের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্যারন ডাগানকে বলেছিলেন, ‘মোসাদ যা করছে তা ঠিক আছে, কিন্তু আমার দরকার ইরান; এটাই তোমার লক্ষ্য।’ এরপর থেকেই ইরানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নাশকতা, বিজ্ঞানী হত্যা, প্রক্সি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান এবং সিরিয়ায় সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও তিনি শক্তিশালী ও কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২২ সালে ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী মোসাদ প্রধানের স্ত্রীর ফোন থেকে চুরি করা তথ্য প্রকাশ করে। ইসরায়েলি প্রসিকিউটরদের দাবি, ২০২৫ সালের যুদ্ধের সময় ইরান জেরুজালেমের সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক করে রিয়েল-টাইম ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করেছিল, যা ইসরায়েলি সম্প্রচারে সেন্সর করা ছিল। তাদের অভিযোগ, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ছবি কিনেছিল এবং ঘুষের মাধ্যমে ইসরায়েলি নাগরিকদের ব্যবহার করে একজন শীর্ষ রাজনীতিকের জগিং রুটও সংগ্রহ করেছিল।
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইন বলেন, দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন সীমান্তবর্তী হামলা চালায় হামাস। ইসরায়েলের দাবি, এ হামলার পেছনে ইরানের সমর্থন ছিল। এই ঘটনার পর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। এর আগে মিশরের জামাল আবদেল নাসের থেকে সিরিয়ার হাফেজ আল-আসাদ—এমন একাধিক প্রতিপক্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশের সক্ষমতা থাকলেও, সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যাকে সীমার বাইরে রাখা হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি নেতাদের হত্যা কেবল নিষিদ্ধ নয় বরং বাস্তব দিক থেকেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যর্থতা লক্ষ্য ব্যক্তির মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে পারে; যেমনটি ফিদেল কাস্তোকে হত্যার জন্য সিআইএ’র একাধিক ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর দেখা গিয়েছিল। আবার সফল হলেও তা অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে।
তবে শাইনের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের ধারাবাহিক গোয়েন্দা সাফল্য, যার মধ্যে ২০২৪ সালে তেহরানে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহর হত্যাকাণ্ড এবং হিজবুল্লাহর হাজারো পেজার ও রেডিওতে ফাঁদ পেতে পরিচালিত ৩০ হাজার কোটি ডলারের বহু বছরের গোপন মিশন এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। তার ভাষায়, “হিব্রুতে আমরা বলি, ‘খাবারের সঙ্গে ক্ষুধাও বাড়ে।’ অর্থাৎ, আপনার যত বেশি থাকবে, তত বেশি চাইবেন।”