যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে আঞ্চলিক পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এ সময়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের মধ্যে এ হামলার প্রতি সমর্থন অত্যন্ত কম। রয়টার্স-ইপসোসের এই জরিপ শনিবার শুরু হয়ে রবিবার শেষ হয়। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ঘোষণা দেয় এই সংঘাতে প্রথম ৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তার আগেই এই জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপে অংশ নেয়া প্রতি চারজনের মধ্যে মাত্র একজন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলাকে সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ ইরানে হামলাকে সমর্থন করেন শতকরা মাত্র ২৫ ভাগ মার্কিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
এই প্রাথমিক ফলাফল আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং আইনপ্রণেতাদের প্রতিক্রিয়াতেও এর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে যখন তারা কঠিন মধ্যবর্তী নির্বাচন মৌসুমের মুখোমুখি।
রবিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, যতক্ষণ না তার সব লক্ষ্য অর্জিত হয়, ততক্ষণ তিনি ন্যায়সঙ্গত মিশন হিসেবে এই অভিযান চালিয়ে যাবেন। রবিবার নিহত তিন মার্কিন সেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি (ইরান হামলা) শেষ হওয়ার আগে আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর, ট্রাম্প আবারও ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, দেশটির নেতারা ‘সভ্যতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।’
তবে রয়টার্স-ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের বড় অংশ এই মতের সঙ্গে একমত নয়। ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তারা যুদ্ধের বিরোধী, আর ২৯ শতাংশ বলেছেন তারা নিশ্চিত নন। রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন তুলনামূলক বেশি হলেও তা খুব জোরালো নয়। তাদের ৫৫ শতাংশ হামলার পক্ষে। ১৩ শতাংশ বিপক্ষে এবং ৩২ শতাংশ অনিশ্চিত। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রায় ৪২ শতাংশ রিপাবলিকান বলেছেন, যদি এই অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনারা নিহত বা আহত হন, তবে তারা এই অভিযানের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেবেন। ডেমোক্রেটদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ হামলার বিরোধিতা করেছেন। ৭ শতাংশ সমর্থন করেছেন এবং ১৯ শতাংশ অনিশ্চিত।
সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন
রবিবার প্রকাশিত এই জরিপ এমন সময়ে এসেছে, যখন বেশিরভাগ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন। তবে এটি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) সমর্থকদের একটি অংশকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধ করা এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদিও ট্রাম্প তার দৃঢ় সমর্থকদের মতামত প্রভাবিত করার অনন্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন, তবুও কিছু রক্ষণশীল ভাষ্যকার সতর্ক করেছেন যে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় নেমেছেন।
প্রয়াত রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্কের সাবেক প্রযোজক ব্লেক নেফ শনিবার এক্সে লিখেছেন- যদি এই যুদ্ধ দ্রুত, সহজ এবং নির্ণায়ক বিজয়ে শেষ হয়, তাহলে অধিকাংশ মানুষ তা মেনে নেবে। কিন্তু যদি যুদ্ধ অন্যরকম হয়, তাহলে প্রচুর ক্ষোভ তৈরি হবে। তিনি আরও লিখেছেন, সাফল্য খারাপ ব্যাখ্যাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করতে হবে।
আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ক্যাটো ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ডগ ব্যান্ডো বলেন, মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার বিষয়টি ‘যুদ্ধের প্রকৃত মূল্যকে সামনে এনে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, বেশির ভাগ আমেরিকান দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। আমেরিকানদের মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, এটি কেবল ভিডিও গেম নয়। তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পাশাপাশি ইরানে কমপক্ষে ২০১ জন, ইসরাইলে ৯ জন, ইরাকে ২ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ জন এবং কুয়েতে ১ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে জরিপে অংশ নেয়া ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা- যার মধ্যে ৩৪ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ৪৪ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার, তারা বলেছেন- যদি যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস বা তেলের দাম বাড়ে, তবে তারা ইরানবিরোধী অভিযানের প্রতি কম সমর্থন জানাবেন। এই সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ফলে কয়েকটি কোম্পানি ওই অঞ্চলে পণ্য পরিবহন স্থগিত করেছে।
নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে জনমতের দিকে ডেমোক্রেটরাও ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখবে। দলটি জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছে এবং ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণ করে নেয়া হয়েছে, তাকে তার নির্বাচনী বার্তার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতাদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন। কমপক্ষে একজন ডেমোক্রেট সিনেটর ট্রাম্পের হামলার প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ খামেনির নিহত হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। আবার কয়েকজন সরাসরি এই হামলার নিন্দা করেছেন। রবিবার কয়েকজন ডেমোক্রেট বলেন, মার্কিন সেনাদের নিহত হওয়া যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব (ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলুশন) পাস করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। যাতে ভবিষ্যতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হয়।
ওই রেজ্যুলুশনের সমর্থক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এক্সে লিখেছেন, ‘আজ নিহত সাহসী মার্কিন সেনাদের কথা ভাবছি। আমাদের সঙ্গে তাদের থাকার কথা ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি আমাদের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন। এটি তার নিজের পছন্দের যুদ্ধ।’
এই প্রস্তাবের ওপর ভোট এ সপ্তাহের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।