Image description

পাকিস্তান গত কয়েক বছরে ধরেই আফগান তালেবানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে তালেবানের উত্থানের সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা করেছিল পাকিস্তান। উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আফগানিস্তানকে ‘কৌশলগত গভীরতা’ হিসেবে ব্যবহার করা।

 

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পুরনো সমীকরণ পাল্টে গেছে। সহযোগী থেকে দুই দেশ এখন একে অপরের চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তবে কেন এই শত্রুতা আর কেনই-বা তালেবানের ওপর পাকিস্তানের হামলা—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

 

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) কাবুলের কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তান রাতের আঁধারে আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে দুদেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সীমান্ত উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

 

পাকিস্তান বলছে, আফগানিস্তান আগে তাদের সীমান্ত বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এর জবাবে সীমান্তবর্তী একাধিক সেক্টরে তালেবান সামরিক পোস্ট, সদর দপ্তর ও গোলাবারুদ ডিপো লক্ষ্য করে বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয়।

 
 

 

অন্যদিকে তালেবান সরকারও পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে। উভয় দেশই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

 

ছবি: সংগৃহীত

গত সপ্তাহান্তে আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর থেকেই উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। এর আগে অক্টোবরেও সীমান্ত সংঘর্ষে দুই দেশের কয়েক ডজন সেনা নিহত হন। পরে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় আলোচনা হয়। সেই আলোচনার ভিত্তিতে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল।

 

এখন প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিনের মিত্রতা কোথায় ভাঙল? বিশ্লেষকদের মতে, মূল বিরোধ সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং পারস্পরিক আস্থার সংকটকে ঘিরে। একসময় যে সম্পর্ক কৌশলগত স্বার্থে গড়ে উঠেছিল, আজ সেটিই অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি হামলার মুখে টালমাটাল। দুই দেশের জন্যই সামনে কঠিন সময়। যুদ্ধ নয়, সংলাপই শেষ পর্যন্ত টেকসই পথ। কিন্তু সেই পথে ফেরার রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা আছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

 

প্রতিবেশীরা এখন কেন প্রতিকূলতার মধ্যে?

 

২০২১ সালে তালেবানরা আবারও ক্ষমতায় ফিরলে ইসলামাবাদ প্রকাশ্যেই তা স্বাগত জানায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে’। কিন্তু খুব দ্রুতই বদলে যায় বাস্তবতা। পাকিস্তান বুঝতে পারে, কাবুলের নতুন শাসকরা তাদের ‘চাহিদা’ অনুযায়ী সহযোগিতার মনোভাব রাখে না।

 

ইসলামাবাদের অভিযোগ, সন্ত্রাসী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানে (টিটিপি) শীর্ষ নেতৃত্ব ও বহু যোদ্ধা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে বলে দাবি পাকিস্তানের।

 

বিশ্বব্যাপী পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী সহিংসতা প্রতি বছর বেড়েছে। বিশেষ করে টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

অন্যদিকে কাবুল এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। তালেবান বলছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বরং তাদের পাল্টা অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের শত্রু গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে। ইসলামাবাদ অবশ্য এ অভিযোগও নাকচ করেছে।

 

পাকিস্তানের বক্তব্য, আফগানিস্তান থেকে জঙ্গি হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধবিরতি টেকেনি। এরপর থেকে সীমান্তে বারবার সংঘর্ষ, গুলি বিনিময় ও সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

 

সর্বশেষ সংঘর্ষের সূত্রপাত কী?

 

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, গত সপ্তাহে খাইবার পাখতুনখোয়ার বাজাউর জেলায় যে হামলায় ১১ নিরাপত্তা সদস্য ও দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, সেটি একজন আফগান নাগরিক চালিয়েছিল। ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে টিটিপি। এই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত চড়তে থাকে।

 

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামাবাদের বক্তব্য, সীমান্তপারের সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও কঠোর হবে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে অন্তত সাতটি পরিকল্পিত হামলার তথ্য তাদের হাতে আছে, যেগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে কাবুল আগের মতোই সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

 

ফলে নিরাপত্তা ইস্যু এখন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে। একসময়কার মিত্র দুই দেশ আজ পারস্পরিক সন্দেহ আর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বৃত্তে আটকে পড়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও মাঠের বাস্তবতার ওপর।

 

পাকিস্তানি তালেবান কারা?

 

২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠন টিটিপি গঠন করে। এটি সাধারণত ‘পাকিস্তানি তালেবান’ নামে পরিচিত।

 

টিটিপি বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশনে আক্রমণ করেছে। এ ছাড়াও দখল করা অঞ্চলের মধ্যে বেশিরভাগই আফগানিস্তানের সীমান্তে, সোয়াত উপত্যকাসহ পাকিস্তানের ভেতরে। ২০১২ সালে তৎকালীন স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলার পেছনে এই গোষ্ঠীর হাত ছিল। হামলায় বেঁচে যাওয়ার দুই বছর পর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

 

টিটিপি আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান তালেবানদের সঙ্গেও যুদ্ধ করেছে এবং পাকিস্তানে আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে। পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান–এর বিরুদ্ধে একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে কিছু সাফল্য মিললেও, সামগ্রিকভাবে জঙ্গি হামলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তবে ২০১৬ সালে শেষ হওয়া একটি বড় সামরিক অভিযানের পর কয়েক বছর ধরে হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল।

 

এরপর কী হতে পারে?

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর পাকিস্তান তার সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে। পাল্টা হিসেবে কাবুল সীমান্ত চৌকি লক্ষ্য করে অভিযান কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আন্তঃসীমান্ত গেরিলা হামলা বাড়াতে পারে। ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে গড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

 

সামরিক শক্তির বিচারে কাগজে–কলমে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। আনুমানিক ১ লাখ ৭২ হাজার তালেবান যোদ্ধা পাকিস্তানের মোট সেনাসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশেরও কম। তালেবানদের হাতে অন্তত ছয়টি বিমান ও ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এসবের কার্যক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। তাদের কোনো কার্যকর যুদ্ধবিমান বহর বা পূর্ণাঙ্গ বিমান বাহিনী নেই।

 

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তাদের কাছে ছয় হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং চার শতাধিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। পাশাপাশি দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী।

 

অর্থাৎ প্রচলিত সামরিক শক্তির হিসাবে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। তবে সীমান্ত অঞ্চলের ভূগোল, গেরিলা কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের বাস্তবতা যুদ্ধের হিসাবকে জটিল করে তোলে। তাই সামরিক সক্ষমতার ফাঁরাক থাকলেও, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সমাধানই শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।