Image description
 

ভলোদিমির জেলেনস্কি, একসময়ের জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন দাপুটে নেতা। ২০১৯ সালে যখন তিনি রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন, তখন তাকে দেখা হচ্ছিলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ত্রাণকর্তা হিসেবে। রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণের শুরুর দিনগুলোতে তার অকুতোভয় ইমেজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু চার বছরের দীর্ঘ যুদ্ধ আর একের পর এক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি সেই ইমেজে চিড় ধরাচ্ছে। ইউক্রেনীয়দের কাছে তার সেই পুরোনো জৌলুস যেন ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

২০১৯ সালে জেলেনস্কি যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন, তখন তার প্রধান পুঁজি ছিল একটি জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল। সেখানে তিনি এমন এক স্কুলশিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে রাতারাতি প্রেসিডেন্ট হয়ে যায়। বাস্তবেও তিনি ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ভূমিধস জয় পান। কিন্তু শাসনের বাস্তবতায় এসে সেই ‘সাধারণ মানুষ’ ইমেজ হোঁচট খেতে শুরু করে। যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তার জনপ্রিয়তা কমে ৩১ শতাংশে নেমে এসেছিল।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ইউক্রেনঅ্যালার্ট সার্ভিসের সম্পাদক পিটার ডিকিনসন একে ইউক্রেনীয় রাজনীতির একটি চক্র হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এখানে নেতাদের প্রথমে ‘ত্রাতা’ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং দ্রুত পরিবর্তন না এলে তাদের ‘পরিত্যগ’ করা হয়।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার হামলার পর জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা এক লাফে ৯১ শতাংশে উঠে যায়। পরনে জলপাই সবুজ টি-শার্ট আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের হাতে তোলা ভিডিও বার্তায় জাতিকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার দৃশ্য তাকে বিশ্বনেতায় পরিণত করে।

তবে সম্প্রতি জেলেনস্কি সড়ক বা সম্মুখসমরের চেয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ এবং বিদেশি কূটনৈতিক সফরেই বেশি সময় কাটাচ্ছেন। গত ডিসেম্বরের জরিপ বলছে, ৬১ শতাংশ মানুষ তাকে বিশ্বাস করলেও ৩২ শতাংশ এখন আর তার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। খোদ ইউক্রেনীয়দের একটি বড় অংশ মনে করছে, যুদ্ধ পরবর্তী নির্বাচনে জেলেনস্কির জয় পাওয়া কঠিন হবে।

২০২৫ সালের শেষের দিকে ইউক্রেন একটি বিশাল দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে কেঁপে ওঠে। জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহলের ওপর নজরদারি বাড়ে এবং তার দীর্ঘদিনের চিফ অব স্টাফ আন্দ্রিয় ইয়ারমাক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ডিকিনসন বলেন, ‘ইউক্রেনীয়রা রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে আগে থেকেই খুব সন্দিহান। তার নিজের নিয়োগ দেওয়া ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা যখন কেলেঙ্কারিতে জড়ান, তা তার ইমেজের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়ায়।’

বিশেষ করে জ্বালানি খাতের দুর্নীতি সাধারণ মানুষের জন্য সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে রুশ হামলায় লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ ও উত্তাপহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর তাদের ক্ষুব্ধ করছে। খারকিভের টেক্সটাইল ম্যানেজার আমিনা ইসমাইলোভা আল-জাজিরাকে বলেন, সেনারা বেতন বা চিকিৎসা পাচ্ছে না, অথচ জেলেনস্কির সহযোগীরা দুর্নীতি করছে, এটি মেনে নেওয়া যায় না।

অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা কমলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে জেলেনস্কি এখনও ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির একটি তিক্ত বৈঠক হয়। সেখানে ট্রাম্প তাকে চাপের মুখে রেখেছেন বা হেয় করছেন; এমন দৃশ্য দেখে ইউক্রেনীয়দের মধ্যে দেশপ্রেমের জোয়ার তৈরি হয়। জেলেনস্কির ওপর আক্রমণকে তারা ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে, যা সাময়িকভাবে তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।

জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা কমলেও তার শক্তিশালী কোনও বিকল্প এখনও দৃশ্যমান নয়। অনেকের মুখে সাবেক সামরিক প্রধান ভ্যালেরি জালুঝনির নাম শোনা যাচ্ছে, যাকে ‘আয়রন জেনারেল’ বলা হয়। যদিও জালুঝনি কখনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা বলেননি। ২০২৪ সালে তাকে সরিয়ে যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি অনেকের মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল যে, জেলেনস্কি তাকে নিজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছেন।

২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য ওয়াশিংটনের চাপ থাকলেও যুদ্ধের কারণে তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তিনি নির্বাচনে ‘প্রস্তুত’। তবে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে তার ক্ষমতায় আসা, সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাওয়াই এখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।