Image description



এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ভারতের লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সংসদে এই বইটির উদ্ধৃতি দিয়ে মোদি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। ওই বইটিতে দাবি করা হয়েছে যে, ২০২০ সালে চীনের সাথে সামরিক উত্তেজনার সময় দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।



সংসদে দাঁড়িয়ে বইটির একটি কপি তুলে ধরে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, ২০২০ সালে লাদাখে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘাতের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বইটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করে বলেন, যখন চীনা ট্যাঙ্ক ভারতের সীমান্তে ঢুকে পড়ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধানকে কোনো স্পষ্ট নির্দেশ না দিয়ে বলেছিলেন— ‘‘আপনার যা সঠিক মনে হয় তাই করুন।’’



গান্ধী আরও কিছু অংশ উদ্ধৃত করেন যেখানে প্রাক্তন সেনাপ্রধান নাকি লিখেছেন যে, ভারত-চীন উত্তেজনার সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তিনি নিজেকে একাকী ও বিচ্ছিন্ন অনুভব করেছিলেন। এই অভিযোগগুলো জেনারেল এম.এম. নারাভানের অপ্রকাশিত বই 'ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি'-তে করা হয়েছে, যা ২০২৪ সাল থেকে সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।



কংগ্রেস নেতা আরও দাবি করেন, বইটি বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে এবং অভিযোগ করেন যে ভারত সরকার দেশে এর প্রকাশনা আটকে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘বইটি বিদেশে পাওয়া যাচ্ছে, এটি বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। সরকার এখানে এটি প্রকাশের অনুমতি দিচ্ছে না।এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে দেশের প্রাক্তন সেনাপ্রধান নিজেকে অত্যন্ত একা ও অসহায় বোধ করেছিলেন সেই সংকটকালে।’’



বিজেপি তথা সরকার পক্ষ এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বলেন, রাহুল গান্ধী একটি 'অপ্রকাশিত' বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে সংসদকে বিভ্রান্ত করছেন এবং নিয়ম লঙ্ঘন করছেন। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু জানান, নারাভানে যা বলেননি তা জোর করে হাউসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।



এই দাবিগুলো ভারতে একটি বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে দেশটির সংসদ অচল হয়ে পড়েছে। সোমবার এক বিতর্কে রাহুল গান্ধী যখন বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন তাকে বারবার বাধা দেওয়া হয়। এরপর সোমবার রাহুল গান্ধী লোকসভায় ওই নিবন্ধের একটি ফটোকপি থেকে অংশবিশেষ পড়ার চেষ্টা করেন। তিনি যখন বলেন, ‘‘এটি সেই সময়ের কথা যখন চারটি চীনা ট্যাঙ্ক ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করছিল,’’ তখনই তাকে কথা বলতে বাধা দেওয়া হয়। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের কারণে সোমবার অধিবেশন মুলতবি করা হয়।



মঙ্গলবারও বিশৃঙ্খলা অব্যাহত থাকে এবং রাহুল গান্ধীকে আবারও বাধা দেওয়া হয়। পরে বিশৃঙ্খল আচরণের জন্য আটজন কংগ্রেস এমপি-কে বরখাস্ত করা হয়।



বুধবার সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে অপ্রকাশিত বইটির একটি কপি তুলে ধরে গান্ধী বলেন যে, বইটির অস্তিত্ব নেই বলে রাজনাথ সিং যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অসত্য। তিনি বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘‘স্থায়ী আদেশ ছিল যে চীনা সৈন্যরা শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়া ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তাদের ওপর গুলি চালানো যাবে না।’’



তিনি আরও বলেন, যখন প্রাক্তন সেনাপ্রধান বারবার রাজনাথ সিংকে ফোন করেছিলেন, তখন তিনি মোদির পক্ষ থেকে একটি বার্তা পৌঁছে দেন যেখানে কার্যত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নারাভানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। গান্ধী নারাভানের বরাতে উদ্ধৃত করেন: ‘‘আমি সত্যিই একা অনুভব করছিলাম। পুরো এস্টাবলিশমেন্ট আমাকে পরিত্যাগ করেছিল।’’



উল্লেখ্য, ২০২০ সালের গ্রীষ্মে লাদাখের গালওয়ান নদী উপত্যকায় বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে ভারত ও চীন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল, যা ১৯৭৫ সালের পর তাদের প্রথম প্রাণঘাতী সংঘাত ছিল। এতে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য এবং অন্তত চারজন চীনা সৈন্য নিহত হয়েছিল।



বইটিতে আসলে কী আছে?

২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে এই বইটি লেখা। 'দ্য ক্যারাভান' ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে: সীমান্তে উত্তেজনার চরম মুহূর্তে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা ছিল না।



সেনাপ্রধানকে বলা হয়েছিল, অনুমতি ছাড়া যেন গুলি চালানো না হয়। জেনারেল নারাভানে সেই সময়ে নিজেকে 'বিচ্ছিন্ন' এবং উর্ধ্বতন নেতৃত্ব দ্বারা পরিত্যক্ত বলে মনে করেছিলেন।



যদিও রাহুল গান্ধী সংসদের বাইরে বইটির একটি অনুলিপি সংবাদমাধ্যমকে দেখিয়েছেন, তবুও ভারতে আনুষ্ঠানিক ভাবে এটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এই ঘটনায় কংগ্রেস দলের আট জন সংসদ সদস্যকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। জেনারেল নারাভানে নিজে এখন পর্যন্ত এই বিতর্ক নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।



বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যদি সামরিক অভিযান বা সংবেদনশীল বিষয়ে বই লিখতে চান, তবে তাকে অবশ্যই সদর দপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। নারাভানের এই পান্ডুলিপিটি ২০২৪ সাল থেকে ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।



এর আগেও কংগ্রেস নেতা চীন ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেছেন। তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন যে মোদি সরকার ২০২০ সালের উত্তেজনার সময় ভারতের ভূখণ্ড চীনের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। মোদি সরকার এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে কোনো জমি হারানো যায়নি।