দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দীর্ঘ ৮০ বছরের যে 'নিয়ম-নির্ভর' বিশ্বব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, তা আজ এক চূড়ান্ত ভাঙ্গনের মুখে দাঁড়িয়ে।
বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে বড় দেশগুলোর পেশিশক্তির লড়াইয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে কানাডা বা ইউরোপের মতো 'মধ্যম শক্তির' রাষ্ট্রগুলো। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক অধিবেশনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং বিভিন্ন দেশের নেতাদের বক্তব্যে এই অশনিসংকেত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
একটি সুন্দর গল্পের করুণ সমাপ্তি
২০০২ সালের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন নাইন-ইলেভেন পরবর্তী ক্ষতবিক্ষত নিউ ইয়র্ক আমেরিকাকে তার বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে সমবেদনা আর সমর্থনের কথা শুনতে চেয়েছিল। তখন মনে করা হতো, আমেরিকার সামরিক শক্তি ও মার্শাল প্ল্যানের মতো উদ্যোগগুলোই ইউরোপে শান্তি ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই 'বেনোভোলেন্ট' বা হিতৈষী শক্তির রূপ আজ বদলে গেছে। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন প্রশাসন যে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি অনুসরণ করছে, তাতে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার উত্থান ঘটছে।
গ্রিনল্যান্ড সংকট ও ইউরোপের পিঠ ঠেকে যাওয়া
গত সপ্তাহে দাভোসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি তার অবজ্ঞা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্ককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং ন্যাটোতে মিত্রদের অবদান নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য কেবল অপমানজনকই নয়, বরং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ফাটলকেও স্পষ্ট করে দেয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের এই আচরণকে 'অত্যন্ত অপমানজনক' বলে অভিহিত করেছেন। আমেরিকার এই এককেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চা এখন কেবল লাতিন আমেরিকা বা এশিয়ার দেশগুলোর ওপর নয়, বরং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ওপরও আছড়ে পড়ছে।
কার্নির হুশিয়ারি: টেবিলে না থাকলে আপনি মেনুতে থাকবেন
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দাভোসে তার বক্তব্যে এক কঠোর বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন আর কোনো রূপান্তর বা ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি একটি বড় ধরনের 'বিচ্ছেদ' বা ফাটল। তার মতে, শক্তিশালী দেশগুলো যখন নিয়ম মানার ভান ছেড়ে দেয় এবং নিজের স্বার্থে বাণিজ্য শুল্ক বা সামরিক শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মধ্যম শক্তির দেশগুলো আর নিরাপদ থাকে না। তার সেই বিখ্যাত উক্তি— যদি আপনি আলোচনার টেবিলে জায়গা না পান, তবে বুঝে নেবেন আপনি অন্যের খাবারের মেনুতে পরিণত হয়েছেন—এখন বিশ্ব নেতাদের জন্য এক সতর্কবার্তা।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি অন্ধকার ভবিষ্যৎ?
ট্রাম্পের এই নীতিকে অনেক ঐতিহাসিক ১৯ শতকের 'মনরো ডকট্রিন'-এর সাথে তুলনা করছেন, যেখানে আমেরিকা নিজের গোলার্ধকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। অতীতে ইরান, গুয়াতেমালা বা পানামায় আমেরিকার হস্তক্ষেপ যেমন ছিল নিয়ম-বহির্ভূত, বর্তমানের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চাপও তেমনি এক স্বেচ্ছাচারী শক্তির বহিঃপ্রকাশ। এই অনিশ্চয়তা এবং অস্থিতিশীলতা বিশ্বকে আবারও সেই প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অরাজকতায় ফিরিয়ে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং দায়বদ্ধ সরকার কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়; এগুলোকে রক্ষা করতে হলে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। আজকের এই ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সামনে এখন একটাই পথ—ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নতুন কোনো জোট গঠন করা।
সূত্র: বিবিসি