গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চাপ মোকাবিলায় ইউরোপ আপাতত ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে। তবে ইউরোপীয় নেতারা জানেন, ক্রমশ আরও কঠোর হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সংঘাতই শেষ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, ন্যাটো জোটে ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী ভূমিকা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থনের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।রয়টার্সের রিপোর্ট
এ সপ্তাহে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্প প্রথমে গ্রিনল্যান্ড দখলে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা নাকচ করেন। এরপর ইউরোপের আটটি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করেন। বরং তিনি ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে আর্কটিক দ্বীপটি নিয়ে একটি অস্পষ্ট চুক্তির কথা উল্লেখ করে সেটিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
ইউরোপীয় নেতাদের ধারণা, গত বছর শুল্ক আলোচনায় তুলনামূলক নরম অবস্থানের বিপরীতে এবার তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন- ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা আলোচনাযোগ্য নয়। এই কঠোর অবস্থানের কারণেই ট্রাম্প কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আমেরিকানদের ইউরোপের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, আমরা যা বলেছি তাতে দৃঢ় থাকা ঠিক কাজ ছিল। কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। আমার মনে হয়, এমন ইস্যুতে আমাদের বারবার পরীক্ষা নেয়া হবে।
ইউরোপ হয়তো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্য বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরবর্তীবার যেন তারা কম ঝুঁকিতে থাকে। কার্নেগি ইউরোপের পরিচালক রোজা বালফুর বলেন, এটা কঠিন পথ, সময় লাগবে। কিন্তু ইউরোপের হাতে যতটা প্রভাব আছে, তারা তা ব্যবহার করতে এখনও সাহস দেখায়নি।
বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় নেতাদের এক জরুরি বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর প্রতিবাদে স্থগিত থাকা ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিকে আবার এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। দাভোসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎসে বলেন, কয়েক মাসের হতাশা ও ক্ষোভ সত্ত্বেও আমাদের ট্রান্সআটলান্টিক অংশীদারিত্বকে খুব তাড়াতাড়ি বাতিল করে দেয়া উচিত নয়।
একদিকে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরূপ মনোভাবের কারণে ইউরোপ এখন সম্পর্ককে ঝুঁকিমুক্ত করার উদ্যোগও নিচ্ছে। ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপকে প্রতিরক্ষা খাতে বিনা খরচে সুবিধা নেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে এবং মার্কিন কোম্পানির জন্য বাজার খুলে দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ইউরোপ ভালোভাবেই জানে ২৭টি দেশের ভিন্ন ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানো কতটা সময়সাপেক্ষ। এই দুর্বলতাকেই এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বিদ্রুপ করে তুলে ধরেছেন।
ইইউর দুই কর্মকর্তা জানান, গ্রিনল্যান্ড বিতর্ক ইউক্রেন মডেলের মতো একটি পদ্ধতি অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগের আলোচনা জোরদার করেছে- যেখানে স্বেচ্ছায় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেয়া হয় এবং কোনো দেশ ভেটো দিতে পারে না।
একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ‘ইচ্ছুকদের জোট’ (coalitions of the willing) আরও বেশি ব্যবহার করা উচিত, যারা চাইবে তারা পরে যোগ দিতে পারে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ইউরোপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। ফ্রান্স, জার্মানি ও বৃটেনকে নিয়ে গঠিত ‘ই৩’ জোটের মতো কাঠামোয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ইইউর বাইরের দেশগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে, যা ট্রাম্পের নীতির চাপে থাকা অন্যান্য দেশের কাছেও আকর্ষণীয়।
দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি বলেন, মাঝারি শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে। কারণ আমরা যদি টেবিলে না থাকি, তাহলে আমরা মেনুতেই থাকব।
তার এই বক্তব্যে জোরালো করতালি পড়ে।
আরেকটি বিকল্প হিসেবে ইউরোপীয় আইন কাঠামোর ভেতরে থাকা বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে। গত ডিসেম্বর ইইউ জরুরি বিধান ব্যবহার করে শত শত বিলিয়ন ডলারের রুশ সম্পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য জব্দ রাখে- যাতে হাঙ্গেরির মতো রাশিয়াপন্থী দেশ বাধা দিতে না পারে।
ইউরোপ তার অর্থনৈতিক নীতিও আরও কঠোর করার পরিকল্পনা করছে।
আগামী মাসে এমন আইন প্রণয়ন শুরু হবে, যাতে কৌশলগত খাতে ‘মেড ইন ইউরোপ’ শর্ত এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ইউরোপীয় কমিশনার স্তেফান সেজুর্নে রয়টার্সকে বলেন, এই বিধানগুলোর অনেকটাই মূলত চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এগুলো আমাদের অন্য বাজার থেকেও ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, এগুলো ওই খাতগুলোর ক্ষেত্রে ইউরোপীয় নীতির চরিত্রই বদলে দেবে।
কানাডার মতো করে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার কোনো পরিকল্পনা ইউরোপের নেই। তবে বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের প্রভাব এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ২০২৫ সালে শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো রপ্তানি বাড়ানোয় ইউরোপের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সাময়িকভাবে বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, জার্মান কোম্পানিগুলো গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ প্রায় অর্ধেক কমিয়েছে।