উচ্চ আয়ের স্বপ্ন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর উন্নত জীবনের হাতছানি-এই আশ্বাস বুকে ধারণ করেই প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছে ‘স্বপ্নের গন্তব্য’।
কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসছে ভিন্ন বাস্তবতা-স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় পৌঁছে অনেক প্রবাসীকেই প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে কঠিন সংগ্রামের সঙ্গে। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির এই ব্যবধানই আজ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট।

মালয়েশিয়া গড়ার নীরব কারিগর বাংলাদেশিরা
মালয়েশিয়ার ১৩টি প্রদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছেন লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক। কুয়ালালামপুরের টুইন টাওয়ার থেকে শুরু করে এমআরটি প্রকল্প, তুন রাজ্জাক এক্সচেঞ্জ, সাইবারজায়া, পোর্ট ক্লাং, পেনাংয়ের বাতু ফেরিঙ্গি, তেরেঙ্গানুর মসজিদ, পাহাংয়ের চা বাগান কিংবা পেরাকের রাবার বাগান-প্রায় সর্বত্রই দেখা মেলে তাদের কর্মব্যস্ত উপস্থিতি।
অল্প সময়েই মালয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

প্রবাসে আসার আগে অধিকাংশ বাংলাদেশির প্রত্যাশা প্রায় একই-উচ্চ আয়, স্থায়ী চাকরি, বৈধ কাগজপত্র, নিরাপদ জীবন, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং ভবিষ্যতে পরিবার নিয়ে বসবাসের সুযোগ।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য নতুন নীতিমালা, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার সেবায় ডিজিটাল পেমেন্ট চালু ও সেবা সহজীকরণের উদ্যোগ কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। কলিং ভিসা বা তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’র প্রলোভনে পড়ে অনেকেই এসে কাজ পান না। কেউ মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, কেউ আবার চুক্তির তুলনায় অনেক কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কাজ হারানো, বেতন কাটছাঁট, হঠাৎ চাকরি ছাঁটাই-সব মিলিয়ে প্রবাসীদের জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
কাগজপত্রের সামান্য ভুল, নিয়োগকর্তার অবহেলা কিংবা দালালের প্রতারণায় অনেক বাংলাদেশি অজান্তেই অবৈধ অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন। এর ফল হিসেবে আটক, জরিমানা কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এতে পুরো কমিউনিটিতেই তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা অসাধু চক্রের তৎপরতায় পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকেই মাঝে মাঝে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে-যা সচেতন প্রবাসীদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।

এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দালালচক্রের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়ে অনেকে এখন কাজহীন, কেউ কেউ আইনের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বৈধতা হারানোর ভয় তাদের ঠেলে দিচ্ছে আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
বৈধকরণ উদ্যোগ: প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ফারাক
অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ করার বিষয়ে বড় প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে সেই উদ্যোগ সীমিত পরিসরেই রয়ে গেছে। হাইকমিশনের সচেতনতা কার্যক্রম চলমান থাকলেও এর সুফল এখনো সবাই পাচ্ছেন না-এমন অভিযোগ প্রবাসীদের।
রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের স্বীকৃতি কোথায়?
মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে প্রবাসী শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম থেকে। অথচ সেই অবদানের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের সংকট বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহে-যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।
অবৈধ অভিবাসন ইস্যু: অভিযান জোরদারের আহ্বান মালয়েশিয়ার
অবৈধ অভিবাসী বা পেনদাতাং আসিং তানপা ইজিন (পাটি) ইস্যু মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। অবৈধ বসতি, ব্যবসা পরিচালনা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও এই অসন্তোষ স্পষ্ট।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান কার্যকর ও ধারাবাহিক আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৫ সালেই ৯০ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসী আটক হয়েছে, যাচাই করা হয়েছে হাজারো ইউএনএইচসিআর কার্ডধারী।
এই অভিযানে ইমিগ্রেশন বিভাগ ছাড়াও পুলিশ, মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি ও সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে।

উত্তরণের পথ
সচেতন মহলের মতে, সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও সমন্বিত ব্যবস্থা। নিয়োগকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রবাসীদের আইনি ও কাগজপত্র বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক সহায়তার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন আজ স্বপ্ন, সংগ্রাম আর বাস্তবতার এক জটিল মিশ্রণ। নতুন নীতিমালা ও কূটনৈতিক তৎপরতা কিছুটা আশার আলো দেখালেও, শোষণ ও অনিশ্চয়তার বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির এই ব্যবধান কমাতে হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি প্রবাসীদের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে টেকসই সমাধান।