ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার এক যুবককে ফাঁসি দিতে যাচ্ছে প্রশাসন— এমন তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানি নামের ওই যুবককে যথাযথ বিচার ছাড়াই বুধবার (১৪ জানুয়ারি) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের (আইএইচআর) বরাতে জানিয়েছে, তেহরানের কাছে কারাজ শহরে গত সপ্তাহে বিক্ষোভ চলাকালে সোলতানিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার পরিবারকে জানানো হয়, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১৪ জানুয়ারি (বুধবার) তা কার্যকর করা হবে।
তার বিরুদ্ধে ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’— এই অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ইরানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
আইএইচআর জানায়, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৪৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে, যাদের মধ্যে নয়জন শিশু রয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
কিছু হিসাব অনুযায়ী, তা ছয় হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন বলেও জানায় তারা। একই সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ধারণা দেওয়া হয়।
আইএইচআরের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র যেভাবে বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের হত্যা করছে, তা ১৯৮০–এর দশকের ভয়াবহ দমন-পীড়নের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, যেগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
আরেক মানবাধিকার সংগঠন ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসি ইন ইরান (এনইউএফডি) সোলতানির ফাঁসি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সংগঠনটি লিখেছে, ‘তার একমাত্র অপরাধ— ইরানের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেওয়া।’
এরফান সোলতানি সম্পর্কে যা জানা গেছে
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ইউএস সানের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কারাজে বিক্ষোভ চলাকালে সোলতানিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার বিরুদ্ধে ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’— এই অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ইরানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
এনইউএফডির দাবি, গ্রেপ্তারের পর তাকে আইনজীবীর সহায়তা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।
ইরানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত থাকায় সোলতানির সম্ভাব্য ফাঁসির খবর এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিক্ষোভ দমনে সরকারের অবস্থান
এদিকে সোমবার দেশজুড়ে সরকারপন্থি সমাবেশ আয়োজন করে রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে ইরান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, এসব সমাবেশ প্রমাণ করে যে সরকারবিরোধী আন্দোলন পরাজিত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেন, এই জনসমাগম একটি ‘সতর্কবার্তা’।
তেহরানে সম্প্রচারিত দৃশ্যে জাতীয় পতাকা হাতে মানুষকে এবং সরকার যাকে ‘দাঙ্গা’ বলছে, তার নিহতদের জন্য প্রার্থনা করতে দেখা যায়।
বিপ্লব চত্বরে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, ইরান এখন চারমুখী যুদ্ধে জড়িত— অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক যুদ্ধ এবং ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ যা তিনি বিক্ষোভের সঙ্গে তুলনা করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর ইরান এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্যে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সাইবার হামলা কিংবা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বিষয়েও আলোচনা চলছে।