ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন প্রবল রক্তপাতের দিকে যাচ্ছে। ১৬ দিন ধরে চলা বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী। ভয়াবহ এ সহিংসতায় রাস্তায় রাস্তায় পড়ে আছে মরদেহ। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন যে, হাসপাতাল আর মর্গগুলোতে জায়গা নেই।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে। আহতের সংখ্যা বহু এবং দেশজুড়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
তেহরান, মাশহাদ, রাশত, শিরাজ, কারাজ—বড় শহরগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট শহরেও চলছে বিক্ষোভ। স্থানীয়দের ভাষ্যে, অনেক জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে। ‘দুই-তিনজন করে প্রতিটি গলিতে মারা যাচ্ছে’—এমনটাই জানিয়েছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।
তেহরানে কাহরিজাক ফরেনসিক মেডিকেল সেন্টারের বাইরে সারি সারি মরদেহ দেখা গেছে। কিছু লাশ সনাক্ত করা যায়নি। অনেকে নিজের স্বজনের ছবি খুঁজছেন। হাসপাতালের একজন কর্মী জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোরে ১৮০ থেকে ২০০ লাশ সেখানে পৌঁছায়, যাদের মাথায় ছিল গুরুতর আঘাত।
এমন এক সময়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যখন ইরানের অর্থনীতি সংকটে, আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হয়েছে এবং বহু ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী বিদেশি হামলায় বিপর্যস্ত।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, তারা নিরস্ত্র। তাদের হাতে শুধু স্লোগান, বিপরীতে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর তাণ্ডব। ‘এটা একতরফা যুদ্ধ’—বলেছেন এক তরুণী। কারও হাতে অস্ত্র নেই, কিন্তু প্রতিদিন মানুষ মরছে। এক নারী বলেছেন, ‘শুক্রবার ছিল রক্তাক্ত দিন। আমি যা দেখেছি, তাতে মনোবল হারিয়ে ফেলেছি।’
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি আর সহিংসতার মধ্যেই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ‘ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে পুরোপুরি প্রস্তুত। সংলাপের পথও খোলা।’
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে আরও ভয়াবহ দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তেহরান সীমা অতিক্রম করতে শুরু করেছে। আমরা কিছু কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করছি।’ তিনি মঙ্গলবার এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলেও জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা, সাইবার অস্ত্র প্রয়োগ, নিষেধাজ্ঞা জোরদার এবং সরকারবিরোধীদের সহায়তার মতো বিকল্প প্রস্তুত রেখেছে হোয়াইট হাউস।
ইরান অবশ্য অভিযোগ করেছে, এই সহিংসতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদ রয়েছে। তারা ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপ’ চালাচ্ছে বলেও দাবি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিহতের সংখ্যা যাই হোক, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এভাবে প্রাণহানি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। আর পরিস্থিতি যদি এই গতিতে এগোয়, তাহলে তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে গড়াতে পারে।