Image description

ইউক্রেনে শত শত ড্রোন ও ‘পারমাণবিক অস্ত্রের মতো’ শক্তিশালী ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া। জানা গেছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনে হামলার জবাব হিসেবেই শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতভর এই হামলা করা হয়েছে।

ইউক্রেনের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ভলগোগ্রাদ শহরের কাছে কাপুস্তিন ইয়ার রেঞ্জ থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা হামলার সময় ‘বজ্রপাতের মতো বিকট শব্দ’ ও উজ্জ্বল আলোর ঝলক দেখতে পাওয়ার কথা জানান।

এদিকে, মধ্যম পাল্লার যে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়া যে হামলা চালিয়েছে, সেটির নাম ‘ওরেশনিক’। ক্রেমলিনের দাবি অনুযায়ী, এটি একটি ‘অত্যাধুনিক’ অস্ত্র, যা কোনোভাবেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়।

রাশিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালে ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে নিক্ষেপ করা হয়। রুশ ভাষায় হ্যাজেল গাছকে ‘ওরেশনিক’ বলা হয়, সেখান থেকেই ক্ষেপণাস্ত্রটির নামকরণ। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের ‘কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে’ এটি আঘাত হানতে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

রুশ সামরিক ব্লগারদের তথ্যমতে, পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলের একটি বড় গ্যাস ডিপোতে এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।

গত বছর রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক রকেট ফোর্সেসের প্রধান সের্গেই কারাকায়েভ বলেন, ওরেশনিক ইউরোপের যে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। কারাকায়েভ রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির দায়িত্বে রয়েছেরঅ

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো গত মাসে জানান, ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তসংলগ্ন তার দেশে ওরেশনিক মোতায়েন করা হয়েছে। এর পরপরই মস্কো ঘোষণা দেয়, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ‘যুদ্ধ প্রস্তুতির দায়িত্বে’ যুক্ত হয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২৪ সালে বলেন, ওরেশনিকে ‘ডজনের পর ডজন ওয়ারহেড, এমনকি লক্ষ্যভেদী ওয়ারহেড’ বহনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, এতে পারমাণবিক ওয়ারহেড নেই। সে কারণে এটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে না ও ব্যবহারের পর কোনো পারমাণবিক দূষণও থাকে না।

পুতিন আরও দাবি করেন, ক্ষেপণাস্ত্রটির ধ্বংসাত্মক উপাদানের তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ফলে বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থলে থাকা সবকিছু ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, এমনকি মৌলিক কণায় বিভক্ত হয়ে কার্যত ধুলায় পরিণত হয়। তিনি আরও বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র ‘গভীর ভূগর্ভে থাকা ও অত্যন্ত সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতেও’ আঘাত হানতে সক্ষম।

২০২৪ সালে দিনিপ্রোতে প্রথম ওরেশনিক হামলার স্থলে বার্তা সংস্থা এএফপি সীমিত ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়। একটি ভবনের ছাদ উড়ে যায় এবং আশপাশের গাছপালা পুড়ে যায়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারাও সীমিত ধ্বংসযজ্ঞের কথা জানান, যা থেকে ধারণা করা হয়—সেই সময় এতে ডামি ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওরেশনিক এমনভাবে তৈরি যে এতে পারমাণবিক ওয়ারহেডও সংযুক্ত করা সম্ভব।

পুতিনের দাবি অনুযায়ী, আধুনিক কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ওরেশনিক প্রতিহত করা ‘অসম্ভব’। তার ভাষ্য, এটি ম্যাক ১০ গতিতে, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি হাইপারসনিক গতিতে চলতে সক্ষম হলেও, এটি প্রচলিত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গতিপথে কৌশলগতভাবে বাঁক নিতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

পোলিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (পিআইএসএম) বিশ্লেষক মার্সিন আন্দ্রেই পিওতরোভস্কি ২০২৪ সালে বলেন, অন্যান্য মধ্যম পাল্লা ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই এর ওয়ারহেড বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে হাইপারসনিক গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

তবে পিওতরোভস্কি যোগ করেন, হাইপারসনিক অস্ত্রের মতো ওরেশনিকের ওয়ারহেডগুলো সেই গতিতে কোনো কৌশলগত গতিপথ পরিবর্তন করেনি, যা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাজকে আরও জটিল করে তুলতে পারতো।

সূত্র: এএফপি