বেইত লাহিয়ার ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয় সাত বছর বয়সী তুলিনকে। দুই বছর পর সে আবার পড়াশোনায় ফিরছে। কিন্তু এই আনন্দের মুহূর্তটি তার ও তার মায়ের জন্য ভয়াবহ আতঙ্কের।
তুলিনের মা আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমার মেয়ে যতক্ষণ না স্কুলে পৌঁছায়, ততক্ষণ বুকের ভেতর ভীষণ ভয় কাজ করে। অনেক সময় না চাইলেও ওর পেছনে পেছনে হেঁটে যাই। ভয় আছে, তবু চাই ও লেখাপড়া শিখুক।’ তিনি জানান, এই যুদ্ধ না হলে তুলিন এখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তবু তারা হাল ছাড়তে রাজি নন।
তুলিনের মতো ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই স্কুলে যাচ্ছে গাজার শিশুদের একটি অংশ। দখলদার দেশটির সেনাবাহিনীর গুলির শব্দের মধ্যেই অস্থায়ী তাঁবুতে তাদের পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
ফিলিস্তিন উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর হামলায় প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে পরিবারগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাঁবু দিয়ে ঘিরে শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছে। এসব এলাকা ইসরায়েল ‘হলুদ রেখা’ বা ‘ইয়েলো জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যদিও এ এলাকা দেশটির বাহিনীর অবস্থানের খুব কাছেই।
‘ঘুমানোর ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ো’
খোলা জায়গা দিয়ে হাঁটার সময় গুলির ভয় তাড়া করে তুলিনকে। সে বলে, ‘স্কুলে যাওয়ার সময় গুলির ভয় পাই। লুকানোর মতো কোনো দেয়ালও নেই।
তাঁবু স্কুলের ভেতরও কোনো নিরাপত্তা নেই। কাপড়ের দেয়াল গুলি ঠেকাতে পারে না। তবু মাটিতে বসে পড়াশোনা করে শিশুরা। একজন শিক্ষক বলেন, প্রায়ই স্নাইপারের গুলিতে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। গুলি শুরু হলে আমরা শিশুদের বলি, ‘ঘুমানোর ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ো। তখন আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন কারও ক্ষয়ক্ষতি না হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একাধিকবার গুলির মুখে পড়েছি। তবু থাকছি। দখলদারদের নীতি অজ্ঞতা ছড়ানো, আর আমাদের নীতি জ্ঞান অর্জন।’
গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতায় প্রায় ছয় লাখ ৩৮ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশু এবং ৭০ হাজার কিন্ডারগার্টেন বয়সী শিশু টানা দুই শিক্ষাবর্ষ হারিয়েছে। তারা এখন তৃতীয় বছরেও শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে।
মানসিক আঘাত ও বই নিষেধাজ্ঞা
ইউনিসেফ ১০৯টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছে। সেগুলোয় প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে। তবে শিশুদের মানসিক ক্ষতি গভীর। অনেকের কথা বলার সমস্যা ও মানসিক বিকাশে পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় প্রায় কোনো শিক্ষাসামগ্রী ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বই, খাতা, কলম– সব কিছুরই তীব্র সংকট।
গাজায় ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকলেও দক্ষিণ গাজায় ভারী গোলাবর্ষণ ও হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি তাঁবুতে বোমা হামলায় পাঁচ বছরের এক শিশু ও তার মামা নিহত হয়েছেন।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪২২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদিকে, রাফা সীমান্ত খুলে দেওয়ার দাবিতে ফিলিস্তিনিরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মানবিক সহায়তা এবং আহতদের দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ চান।
লন্ডনে ফিলিস্তিনের দূতাবাস উদ্বোধন
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দূতাবাস। গত সোমবার পশ্চিম লন্ডনের হ্যামারস্মিথে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দূতাবাসের উদ্বোধন করা হয়। লন্ডনে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট এই অর্জনকে একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ এবং ব্রিটিশ-ফিলিস্তিনি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।