ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বিনিয়োগ দুনিয়ায় এক অটল মানদণ্ডের নাম ওয়ারেন বাফেট। বাজার যখন ট্রেন্ড, গুজব আর ঝুঁকির উত্তাল ঢেউয়ে দুলে ওঠে, তখন তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন সম্পূর্ণ উল্টো স্রোতে। সম্প্রতি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সিইও পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেও, তার বিনিয়োগ দর্শন আজও বিনিয়োগকারীদের জন্য অমূল্য পথনির্দেশনা।
বাফেট বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন সফল বিনিয়োগ মানে শুধু কোথায় টাকা লাগাবেন, তা জানা নয়; বরং কোথায় কখনোই টাকা লাগাবেন না, সেটি বোঝাই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি সচেতনভাবে কিছু খাত এড়িয়ে চলেছেন। নিচে তুলে ধরা হলো সেই ছয়টি খাত, যেগুলোকে তিনি বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছেন।
সবচেয়ে আগে আসে প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ। দ্রুত বড় হওয়া প্রযুক্তি কোম্পানির ঝলমলে গল্প বাফেটকে বরাবরই সতর্ক করেছে। অতিরিক্ত মূল্যায়ন, অনিশ্চিত ব্যবসা মডেল এবং ভবিষ্যৎ আয়ের অস্পষ্টতা—এই তিন কারণেই তিনি দীর্ঘ সময় অ্যামাজন, গুগল বা ফেসবুকের মতো কোম্পানি থেকে দূরে ছিলেন। তার বিনিয়োগ দর্শনের কেন্দ্রে থাকা ‘মার্জিন অব সেফটি’ অধিকাংশ স্টার্টআপই দিতে পারে না। যদিও অ্যাপলের ব্যবসা দীর্ঘদিন স্থিতিশীল প্রমাণিত হওয়ার পর সেখানে বড় বিনিয়োগ করেছিলেন, তবে ২০২৪ সালে বিপুল শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি খাতে তার আস্থা এখনো সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়।
দ্বিতীয় খাত টেসলা। বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লবের প্রতীক হলেও টেসলা কখনোই বাফেটের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেনি। শেয়ারের চরম অস্থিরতা, দ্রুত বদলে যাওয়া শিল্প এবং নেতৃত্বকে ঘিরে বিতর্ক তাকে বরাবরই শঙ্কিত করেছে। বাফেট বিশ্বাস করেন, একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম তৈরি হতে সময় লাগে, কিন্তু তা ভাঙতে এক মুহূর্তই যথেষ্ট—এই ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। বিটকয়েনসহ ডিজিটাল কয়েনের পুরো ধারণাটিই তার কাছে বরাবর রহস্যময় ও সন্দেহজনক। যে সম্পদ নিজে কোনো আয় তৈরি করে না এবং যার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন, সেখানে বিনিয়োগ তার দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদিও একবার সীমিত আকারে এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছিলেন, যাদের ক্রিপ্টো কার্যক্রম রয়েছে, সেটি ছিল ব্যতিক্রম মূল নীতির পরিবর্তন নয়।
চতুর্থ খাত জটিল ডেরিভেটিভস। বাফেট একে আখ্যা দিয়েছেন ‘আর্থিক গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ হিসেবে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট দেখিয়েছে, এই জটিল আর্থিক চুক্তিগুলো কীভাবে মুহূর্তেই বাজার ধসিয়ে দিতে পারে। ঝুঁকি পুরোপুরি না বুঝে এসব পণ্যে বিনিয়োগ করলে সর্বস্বান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তিনি এ খাতকে কঠোরভাবে এড়িয়ে চলেন।
পঞ্চম খাত সোনা। অনেক বিনিয়োগকারীর চোখে সোনা নিরাপদ আশ্রয় হলেও, বাফেটের দৃষ্টিতে এটি একটি অপ্রোডাকটিভ সম্পদ। তার যুক্তি সোনা কিছু উৎপাদন করে না, আয় সৃষ্টি করে না, শুধু পড়ে থাকে। একসময় স্বর্ণখনি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলেও সেটি ছিল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, সোনার প্রতি আস্থার প্রতিফলন হিসেবে নয়।
সবশেষে আসে এয়ারলাইনস খাত। এই খাতে বিনিয়োগ করে একসময় বড় ভুল করেছিলেন বাফেট নিজেই। কোভিড মহামারিতে বিমান পরিবহন শিল্প যখন ধসে পড়ে, তখন তিনি বড় ক্ষতি মেনে নিয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেন। দুর্ঘটনা, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং অনিশ্চিত চাহিদার কারণে এরপর থেকে এই শিল্পকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য অনিরাপদ হিসেবেই দেখেন।
ওয়ারেন বাফেটের সাফল্যের গল্প শুধু লাভের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সংযম, ধৈর্য এবং সময়মতো ‘না’ বলার সাহসের গল্প। তিনি দেখিয়েছেন, বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় জ্ঞান হলো সব সুযোগ লুফে না নেওয়া। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য বাফেটের এই ছয়টি বর্জনীয় খাত হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পাঠ। কারণ শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য আসে তখনই, যখন আপনি জানেন কোথায় টাকা ঢালবেন না