Image description

ইয়েমেনের এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে ভেঙে দিয়েছে, যে জোট মূলত ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গঠিত হয়েছিল।

ইয়েমেনের সংঘাতে জড়িত প্রধান পক্ষগুলোর সংঘাত বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটির জন্ম দিয়েছে।

হুতি
আনসার আল্লাহ নামে পরিচিত হুতি আন্দোলন ২০১৪ সালের শেষ দিকে সৌদি-সমর্থিত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে উৎখাত করলে ইয়েমেনের সংঘাতের সূচনা হয়।

গোষ্ঠীটি এখনো দেশের প্রধান সামরিক শক্তি—তাদের নিয়ন্ত্রণে রাজধানী সানা এবং ঘনবসতিপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকা। অনুমান করা হয়, তারা এমন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে যেখানে দেশের ৬০–৬৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযোগ, ইরান হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা দেয়। তবে হুতিরা বলে, তারা ইরানের প্রক্সি নয় এবং নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে।

ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরব ও আমিরাতে হামলার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা দেখিয়েছে হুতিরা। তাদের লক্ষ্য ছিল তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

ইরান-সমর্থিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক জোটের অংশ হিসেবে দেখা হয় হুতিদের। গাজা যুদ্ধেও তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি জোটের বোমাবর্ষণ, পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের হামলা—সবকিছুর মধ্যেও হুতিরা টিকে আছে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

সৌদি আরব
২০১৫ সালের মার্চে রিয়াদ হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠন করে ইয়েমেনে প্রবেশ করে, হাদির সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল যার লক্ষ্য। দক্ষিণ সীমান্তের ওপারে ইরান-ঘনিষ্ঠ কোনো গোষ্ঠী ক্ষমতা সুসংহত করুক তা ঠেকাতেই সৌদির এই পদক্ষেপ।

চীন-সুবিধাভোগী সাম্প্রতিক সমঝোতা সত্ত্বেও রিয়াদ ও তেহরান বহুদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন।

এসটিসি (সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল)

সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রশিক্ষিত ও সজ্জিত এসটিসি দক্ষিণের স্বাধিকার চায়, যা ১৯৯০ সালে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ নতুন করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর বাহিনী দ্রুত তা দমন করে।
আইদারুস আল-জুবাইদির নেতৃত্বাধীন এসটিসি আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হলেও ২০২০ সালে দক্ষিণে স্বশাসন গঠনের ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর তারা হাদ্রামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে সৌদি সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হলে উত্তেজনা চূড়ায় পৌঁছয়, যা মূলত আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদির প্রভাবকেই চ্যালেঞ্জ জানায়।

ইসলামি পার্টি (ইসলাহ)

ইয়েমেনি কংগ্রিগেশন ফর রিফর্ম বা আল–ইসলাহ হলো মুসলিম ব্রাদারহুড–ঘনিষ্ঠ সুন্নি ইসলামপন্থী আন্দোলন। এটি স্বীকৃত সরকারের একটি বড় অংশ, কিন্তু আমিরাত ও এসটিসির চোখে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’। দেশের একমাত্র গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল এবং অন্যতম বৃহৎ তেলক্ষেত্রের অধিকারী মারিব দলটির শক্ত ঘাঁটি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছিল আমিরাত, যা স্থলযুদ্ধে ছিল সবচেয়ে কার্যকর বাহিনীগুলোর একটি। ২০১৯ সালে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে ২০২০ সালে তা শেষ করলেও এসটিসি ও অন্যান্য গোষ্ঠীর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে প্রভাব বজায় রেখেছে তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি বৈরিতা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের কৌশলগত নৌপথ সুরক্ষাই আবুধাবির মূল প্রেরণা।

সৌদি-সমর্থিত সরকার

রাশাদ আল-আলিমির নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলই হলো ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের ক্ষমতা দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। হুতিবিরোধী শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে ২০২২ সালের এপ্রিলে রিয়াদে হাদিকে সরিয়ে এই কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু যে বিভাজন দূর করার কথা ছিল, সেটাই কাউন্সিলকে পক্ষাঘাতে ফেলেছে।

এসটিসির ডিসেম্বর আক্রমণের পর সরকারের কার্যত নিয়ন্ত্রণ এখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন এলাকায় সীমিত এবং তারা সৌদি বিমান শক্তির ওপর নির্ভরশীল।

ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস

ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস হলো সুসজ্জিত এক হুতিবিরোধী বাহিনী, যার নেতৃত্বে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর ভাতিজা এবং পিএলসির সদস্য তারেক সালেহ। পশ্চিম উপকূলে হুতিদের মোকাবেলায় আমিরাতের সহায়তায় গঠিত এই বাহিনী সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং একতাবদ্ধ ইয়েমেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেদেরকে হুতি ও দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী—দুপক্ষেরই ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।