ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ভারী বৃষ্টিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের হাজার হাজার তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্লাবিত হয়েছে। এতে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার পরিবার। যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে টানা বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার রাত থেকে গাজায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাস শুরু হয়। এতে উপত্যকাজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার তাঁবু প্লাবিত হয়েছে। এসব তাঁবুতে বসবাস করছিলেন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিতে তাঁবুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় দেয়াল ও ছাদের অংশ ধসে পড়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, তাঁবুতে পানি ঢুকে পড়ায় জরুরি সহায়তা চেয়ে তারা অন্তত ১ হাজার ৫০০টি ফোনকল পেয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ঝড়ের কারণে দুই হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য অন্তত তিন লাখ তাঁবু প্রয়োজন।
আলজাজিরার প্রতিবেদক ইব্রাহিম আল-খলিলি গাজা নগরী থেকে জানান, অস্থায়ী তাঁবুগুলো প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারছে না। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি ও বাতাসেই অনেক আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গদির পাশাপাশি বালিশ ও কাপড়চোপড় ভিজে গেছে। প্রায় চার লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ এমন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন, যেগুলো বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক আশরাফ আবু আমরাও জানান, বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরিবারগুলো শনিবার সকাল থেকে খাদ্যসহায়তা পায়নি।
উদ্ধার তৎপরতায় সংকট
গাজার পৌরসভা ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানির সংকট এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে বন্যার পানি সরানো ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিলের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জোনাথন ভেইচ বলেন, গাজার অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত দুরবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন। জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে আরও অর্থায়নের প্রয়োজন।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের হিসাবে, ঝড়ে প্রায় ৩০ লাখ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ছে ত্রাণ সংস্থাগুলো।
ফিলিস্তিনের নাগরিক সমাজের কয়েকটি সংগঠনের জোট সতর্ক করে বলেছে, বন্যায় লাখো মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোগ ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
আশ্রয়কেন্দ্র ও নির্মাণসামগ্রী নিয়ে অভিযোগ
গাজার নগর কর্তৃপক্ষ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কমিটির কর্মকর্তা মুস্তাফা ক্বাজ্জাতের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য পূর্বনির্মিত ঘর প্রবেশের অনুমতি দেয়নি ইসরায়েল। সীমিতসংখ্যক তাঁবু প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গাজায় জরুরিভিত্তিতে দুই লাখ পূর্বনির্মিত ঘর প্রয়োজন। পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ সরানো, প্রধান সড়কগুলো সচল করা এবং বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারী যন্ত্রপাতিও দরকার।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন গাজায় ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়কারী সংস্থা কোগাত এ অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলের হামলায় গাজার ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপত্যকাটির অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবুতে বসবাস করছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজা পুনর্গঠনের কথা থাকলেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা অচল থাকায় পুনর্গঠন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করছেন, যেগুলো বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।