মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন জরিপে আভাস দেয়া হয়েছিল যে, এবারে বিরোধী ডেমোক্রেট পার্টির জয়জয়কার হতে যাচ্ছে। তবে জরিপের ফল ছাপিয়ে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে লজ্জাজনকভাবে ধয়াশায়ী হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ- সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে ডেমোক্রেটরা। এর ফলে আগামী দুই বছর কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণে থাকবে ট্রাম্পবিরোধীদের।
এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত, ২৩২ আসন পেয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্রেটরা। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ১৩৯ আসন। প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি আসনের মধ্যে যেকোনো দল ২১৮টি আসন পেলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষেও বাজিমাত করেছে ডেমোক্রেটরা। প্রাপ্ত ফলাফলের মধ্যে ১০০ সদস্যের সিনেটে ডেমোক্রেটরা ৫৪টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে, আর রিপাবলিকানরা পেয়েছে ৪৩টি আসন।
ডেমোক্রেটদের এই নির্বাচনী বিজয় ১৯৯০-এর দশকের পর দলটির সবচেয়ে বড় জয় হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ২০০৮ সালের পর সিনেটে দলটি সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নির্বাচনে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাকি আসনগুলোতে আগে থেকেই নির্বাচিত সিনেটররা দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটদের হাতে চলে আসায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময় জুড়ে ওয়াশিংটনে দলটির প্রভাব ও অবস্থান আরও জোরালো হবে। এদিকে এরই মধ্যে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ভূমিকা রেখেছে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, গ্যাসের অতিরিক্ত মূল্য রিপাবলিকান পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং যখন মানুষকে জ্বালানির জন্য বেশি টাকা দিতে হয়েছে, তখন তা মানুষ “পছন্দ করেনি’’। তবে তিনি রিপাবলিকান পার্টির এই ভরাডুবির জন্য দলটির প্রার্থীদের দায়ী করেছেন।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার চারটি প্রথম ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ডেমোক্রেট প্রার্থী আবদুল এল সাইদ প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর হতে চলেছেন। সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, সায়েদ ৫১.৮ শতাংশ বা ২২,২৬,৭৮৪ ভোট পেয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করেছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ৪৬.২ শতাংশ বা ১৯,৮৩,৪৭৭ ভোট।
এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা হলো দেশটির ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হওয়া। বিবিসি জানিয়েছে, জর্জিয়ার গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে কেইশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম প্রকাশ্য সমকামী পুরুষ হতে চলেছেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের ক্রিস পাপাস। এ ছাড়া ডেব হাল্যান্ড নিউ মেক্সিকোতে জয়লাভের মাধ্যমে প্রথম আদিবাসী আমেরিকান নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।
এসব নেতাদের বিজয়কে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই) নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন ডেমোক্রেট কংগ্রেসম্যান রো খান্না।
সামনে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা
আগামী বছর নতুন ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, ইরান যুদ্ধ, হোয়াইট হাউসের দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্ষমতায় আসার পর প্রায় দুই বছরে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়েছে-এমন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়েও ধারাবাহিক তদন্ত শুরু হতে পারে। এতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনদের ওপর চাপ বাড়বে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্রেটদের হাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা এসেছে। ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে নতুন নিয়োগ আটকে দেয়ার ক্ষমতা থাকবে তাদের হাতে। একইভাবে দলের বিরোধিতা রয়েছে-এমন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ অনুমোদন না দেয়ার সুযোগও পাবে তারা।
এনিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র দলীয় সংঘাতের সময় শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনী ধাক্কায় ট্রাম্প আহত হলেও কার্যত তিনি এখন ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট। তবে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টিকারী এই প্রেসিডেন্টকে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে দেখা যাবে, এমনটা মনে হয় না।
দেশটিতে বাজেট নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেয়ার আগে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ শেষ করতে না পারলে এ যুদ্ধ নিয়েও সংঘাত তীব্র হতে পারে।
নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশ পরিচালনার চেষ্টাকে ঘিরে সাংবিধানিক বিরোধ এবং ট্রাম্পের সহযোগীদের সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করতে ডেমোক্রেটদের জারি করা সমন নিয়েও দীর্ঘ লড়াইয়ের আশঙ্কা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিদেশের মাটিতে ট্রাম্প আরও খামখেয়ালি ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারেন।
ডেমোক্রেটদের সামনে চ্যালেঞ্জ
অন্যদিকে, বিজয়ের উৎসব শেষ হলে ডেমোক্রেটদের সামনেও কঠিন বাস্তবতা হাজির হবে। তারা ক্ষমতার একটি বড় অংশ পেলেও ভোটারদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনার মতো পূর্ণ ক্ষমতা পাবে না। এর কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে থাকবে বিল আটকে দেয়ার ভেটো ক্ষমতা। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে মাত্র দুই বছর পর পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটরাও বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে পারেন।
কেননা, এরইমধ্যে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ডেমোক্রেটরা কোনো বিল উত্থাপন করলে তিনি তাতে ভেটো দেবেন। এনিয়ে মঙ্গলবার ভেটো লেখা থাকা একটি টুপির ছবি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন ট্রাম্প।