Image description
 
প্রথম পর্ব
ট্রাম্পের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন — হোয়াইট হাউস বনাম কংগ্রেস, যুদ্ধনীতির ভবিষ্যৎ ও ২০২৮-এর রাজনীতি
২০২৬ সালের ৪ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেল। নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাস্ত করে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় পক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পর কংগ্রেসের দুই কক্ষেই 'ব্লু ওয়েভ' বা ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে।
 
ইরান সংঘাতের ব্যয়,বিশ্বজুড়ে জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে এই নির্বাচনে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো রূপ নিয়েছে একটি স্পষ্ট 'ডিভাইডেড গভর্নমেন্ট' বা বিভক্ত সরকারে। এই নতুন প্রেক্ষাপটে আমেরিকার পররাষ্ট্র ও যুদ্ধনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং ২০২৮ সালের মার্কিন নির্বাচনের গতিপথ কোথায় গিয়ে ঠেকবে—তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
 
১.যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: ক্ষমতার নতুন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণ
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মূল বার্তা হলো—হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহাল থাকলেও ক্যাপিটল হিলে তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব ও আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।
সিনেটের পরিবর্তন: টেক্সাসে জেমস ট্যালারিকো এবং উত্তর ক্যারোলিনায় রয় কুপারের ঐতিহাসিক জয়সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে রিপাবলিকানদের হারিয়ে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ: প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের সীমা পার করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
 
প্রেসিডেন্টের ওপর প্রভাব: এই নতুন দ্বিকক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে সুযোগ এনে দিয়েছে ট্রাম্পের বিচার বিভাগীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগে বাঁধা দেওয়া, প্রশাসনিক দুর্নীতির তদন্ত চালানো এবং বাজেট আটকে দেওয়ার।
এই ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী স্বেচ্ছাচারিতার পথে প্রধান প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে।
 
২. প্রেসিডেন্ট বনাম কংগ্রেস: যুদ্ধ পরিচালনার সাংবিধানিক ভারসাম্য ও সীমিত ক্ষমতা
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর 'কমান্ডার-ইন-চিফ' বা সর্বাধিনায়ক হলেও যুদ্ধের অর্থায়ন ও আইনগত অনুমোদনের ক্ষমতা শুধুই কংগ্রেসের। ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত নতুন কংগ্রেস ট্রাম্পের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর অন্তত তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে:
সামরিক বাজেট ও অর্থায়ন আটকে দেওয়া (Power of the Purse): ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ সালের শুরুতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। ডেমোক্র্যাটরা এখন ইরান ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বাড়তি অর্থায়নে সরাসরি ভেটো দিতে পারে বা কঠোর শর্ত জুড়ে দিতে পারে।
ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন (War Powers Resolution of 1973): এই আইনের মাধ্যমে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট মেয়াদের পর অনুমোদন ছাড়া কোনো যুদ্ধ চালনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করার প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও গণশুনানি: প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সামরিক উপদেষ্টাদের কংগ্রেসে ডেকে এনে প্রকাশ্য শুনানির মুখোমুখি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি, গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে জনগণের সামনে প্রশ্ন তোলা সহজ হবে।
 
৩. ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, MAGA আন্দোলন ও ২০২৮-এর সমীকরণ
এই নির্বাচনী আঘাত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল এবং তাঁর নিজস্ব 'MAGA' (Make America Great Again) আন্দোলনের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
MAGA ধারার দুর্বলতা: ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির বিপরীতে নতুন কোনো অসীম যুদ্ধে জড়ানো, বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য তৈরি হওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা MAGA ঘাঁটির সমর্থক ও মধ্যপন্থী ভোটার উভয়কেই দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন: মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর জেডি ভ্যান্সসহ রিপাবলিকান নেতৃত্বের জন্য ট্রাম্পের ঐতিহ্য বহন করা কঠিন হবে। দলের ভেতরের মধ্যপন্থী অংশ ট্রাম্পের একক নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করবে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল দৌড়: ২০২৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা একধরনের সুবিধা নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। ট্রাম্পের শেষ দুই বছর ক্রমাগত আইনি জবাবদিহি, অর্থনৈতিক সংকট ও বিভক্ত সরকারের দ্বন্দ্বে কাটার ফলে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীরা আরও সুসংহত হয়ে মাঠে নামার সুযোগ পাবেন।
 
ট্রাম্প কি এখন থেকে নিজের ইচ্ছামতো যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারবেন? এক কথায়: না, আর পারবেন না।
তবে এটিও সত্য যে, প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ভেটো ক্ষমতা এবং সরাসরি সামরিক আদেশ দেওয়ার ক্ষমতার কারণে ট্রাম্প একতরফাভাবে সীমিত বিমান হামলা, নির্বাহী আদেশ প্রদান বা শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম থাকবেন। কিন্তু যেকোনো বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনা, নতুন সেনা মোতায়েন কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থ বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তাঁর হাত পুরোপুরি বেঁধে ফেলবে। ফলে, ট্রাম্পের একচ্ছত্র পররাষ্ট্রনীতির দিন শেষ হয়ে এখন শুরু হলো হোয়াইট হাউস ও ক্যাপিটল হিলের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা ও কঠোর লড়াইয়ের যুগ।