Image description

ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের ইঙ্গিত মিলছে। একই সঙ্গে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ফলাফলও সামনে এসেছে। সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ জোট এগিয়ে গেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের জোটও পেছাতে পেছাতে থমকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির রাজনীতিতে চরম অচলাবস্থা তৈরি হলেও আকস্মিকভাবেই সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি চলে এসেছে আরব দলগুলোর হাতে। যদিও নেতানিয়াহু বা আইজেনকোট, কেউই তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নন।

 

১২০ আসনের নেসেটে (ইসরায়েলের পার্লামেন্ট) সরকার গঠনে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ৫৩টি আসন পেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে নেতানিয়াহুর জোট। অন্যদিকে আইজেনকোটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করলেও নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা এখনও সরকার গঠনের ম্যাজিক নম্বর ৬১ থেকে বেশ কিছুটা দূরে।

আর এখানেই আবির্ভাব ঘটেছে ইসরায়েলের আরব দলগুলোর। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি আরব দল এ পর্যন্ত যৌথভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। গাণিতিকভাবে তারা নেতানিয়াহু বা আইজেনকোট যেকোনও পক্ষকে সরকার গঠনের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিতে পারে।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে ২১ লাখ ৫৭ হাজার আরব নাগরিক রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ২১.১ শতাংশ। এ বছর তাদের মধ্যে অভূতপূর্ব ভোটদানের হার দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির মতে, দেশজুড়ে গড় ভোট পড়েছে ৭৭.৭ শতাংশ (১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ)। কিন্তু আরব ভোটারদের মধ্যে এই হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। যেমন নাজারেথে তা পৌঁছেছে ৭২.২ শতাংশে এবং রাহাটে ভোট পড়েছে ৮২ শতাংশ।

 

এবারের নির্বাচনে আরবদের প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলোর মধ্যে ইউসেফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন দ্য জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১২টি আসন। অন্যদিকে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি দল রা’আম জিতেছে ৭টি আসন।

 

তবে মূল দলগুলো আরবদের ওপর নির্ভরশীল হতে নারাজ। গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিরোধী ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকোট সাফ জানিয়ে দেন, তার শর্ত না মানলে রা’আম-কে জোটে নেওয়া হবে না। দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আইজেনকোট বলেন, আরব ও হারেদি দলগুলোকে ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করতে হবে, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র ও সর্বজনীন সামরিক সেবাকে সমর্থন জানাতে হবে এবং হামাসকে ধ্বংসযোগ্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই মুহূর্তে এসব নীতি মেনে নেয় এমন কোনও আরব বা হারেদি দল আমি দেখছি না।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু আরবনির্ভর সরকার গঠনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখিয়েছেন। ভোটের আগে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে ঝুঁকিতে ফেলা এবং জায়নবাদবিরোধী আরব দলগুলোর ওপর ভিত্তি করে সরকার গঠন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারা আমাদের অস্তিত্বের বিরোধিতা করে, হামাসকে দাতব্য সংস্থা মনে করে এবং আমাদের সৈনিকদের যুদ্ধাপরাধী বলে।

 

তবে এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ ইসরায়েলে একদম নতুন নয়। ২০২১ সালে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোটে যোগ দিয়েছিল মানসুর আব্বাসের রা’আম।

এবারও একই প্রস্তাব দিচ্ছে আরব দলগুলো। চ্যানেল ১৩-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিন বলেন, নেতানিয়াহুর রক্তক্ষয়ী সরকারের সত্যিকারের বিকল্প দিতে চাইলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

অন্যদিকে রা’আম প্রধান মানসুর আব্বাস চ্যানেল ১২-কে জানান, তিনি উভয় শিবিরের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।

যদি বর্তমান অচলাবস্থা কাটানো না যায়, তবে বিরোধীদের সামনে কেবল দুটি পথ খোলা থাকবে। নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের পর্যায়ক্রমিক প্রধানমন্ত্রিত্বের একটি ঐক্য সরকার গঠন করা, অথবা নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকতে দেওয়া। কিন্তু এই দুই বিকল্পের কোনোটিই আইজেনকোটের জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।