Image description

ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনে স্মরণীয়ভাবে ফিরে এলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডা সিলভা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটে ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ পেয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হলেন ৮০ বছর বয়সী বামপন্থী লুলা। কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। ফ্লাভিও হলেন ব্রাজিলের সাবেক অতি-ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে। জাইর বর্তমানে ২০২২ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের দায়ে সাজা খাটছেন।

 

১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম কোনো প্রার্থী হিসেবে প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় জয়ী হওয়ার নজির গড়লেন তিনি।

 

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিওর চেয়ে বিশ লাখেরও বেশি ভোটে পিছিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন লুলা। ভোটের সেই ঘাটতি পূরণ করে দ্বিতীয় দফায় চুয়াল্লিশ লাখ ভোটের বড় ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে আনেন তিনি। প্রচার কৌশলে দ্রুত পরিবর্তন, তরুণদের অভাবনীয় জাগরণ, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মারাত্মক কিছু ভুল এবং কেন্দ্রে ভোটারদের উপচে পড়া উপস্থিতি এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

 

কেন প্রথম দফায় পরাজয়

গত ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে ডানপন্থী লিবারেল পার্টির প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারো ৪৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে শীর্ষে উঠে আসেন। ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট। প্রথম দফায় লুলা পিছিয়ে ছিলেন প্রায় ২২ লাখ ভোটে।

'দ্য ব্রাজিলিয়ান রিপোর্ট'-এর প্রধান সম্পাদক গুস্তাভো রিবেইরোর মতে, অতিরিক্ত আত্মতুষ্টির কারণেই প্রথম দফায় বড় ধাক্কা খেয়েছিল লুলার শিবির। প্রথম দফার আগে তাদের প্রচার কৌশল দেখে মনে হচ্ছিল জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। রিবেইরো বলেন, তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ না রেখে পুরোনো আমলের অফলাইন নির্ভর প্রচারণার কারণেই মানুষের মাঝে কোনো উদ্দীপনা হয়নি।

প্রথম দফার নির্বাচনে ৩ কোটি ৩৪ লাখের বেশি ভোটার কেন্দ্রে যাননি, যা মোট ভোটারের প্রায় ২১ শতাংশ। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের পুরোনো প্রচার কাঠামো নিজের ভোটব্যাংককে জাগিয়ে তুলতে এবং ডানপন্থীদের উত্থান ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।

তিন সপ্তাহের ব্যবধানে কী এমন হলো

রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটের মুখে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের নির্বাচনী প্রচারে অদ্ভুত মোড় আনে লুলার দল। এই পুনর্জাগরণের পরিকল্পনা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোপন সভাকক্ষে নয়, সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহে সূচনা ঘটেছিল।

প্রথম দফায় বোলসোনারোর এগিয়ে থাকার খবর দেখে ব্রাজিলের তরুণ সমাজ অনলাইনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘লুলার ফৌজ’ (লুলাস আর্মি) নামে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সাও পাওলো থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি মনিকা ইয়ানাকিয়েভ জানান, লাখ লাখ তরুণ ব্রাজিলের অলিগলিতে নেমে আসেন। প্রাণহীন হয়ে পড়া নির্বাচনী প্রচারে এই তৃণমূল তরুণ শক্তি নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।

পতাকা হাতে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে নামা প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: সংগৃহীত
পতাকা হাতে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে নামা প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: সংগৃহীত

 

দলীয় প্রচার কৌশলও দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যম ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক প্রচারে মনোযোগ দেয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে লুলা ১৯৮৫ সালের সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর গড়ে ওঠা সামাজিক সুরক্ষার কথা বারবার মনে করিয়ে দেন। কট্টর ডানপন্থীদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন তিনি।

ডিজিটাল বৈষম্য ও অ্যালগরিদমের বাধা জয়

বড় বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের পক্ষপাতমূলক পরিবেশের মধ্যেও লুলার এই অনলাইন বিপ্লব বিশেষ নজর কেড়েছে। ব্রাজিলে ৭৬ শতাংশেরও বেশি ভোটার খবরাখবরের জন্য অনলাইনের ওপর নির্ভর করেন। সামাজিক মাধ্যমই এখন দেশটির প্রধান রাজনৈতিক রণাঙ্গন। মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ) রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনী খরচ ২০২৬ সালে ২৮ কোটি ৮০ লাখ ব্রাজিলিয়ান রিয়ালে (৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার) পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের নির্বাচনের দ্বিগুণেরও বেশি।

 

অভিযোগ উঠেছে মেটা লুলার নির্বাচনী প্রচারণার পোস্ট রিচ কমিয়ে দিয়ে বলসোনারোকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে। এমনকি একপর্যায়ে লুলার অফিশিয়াল বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্টও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ব্রাজিলের কঠোর আইন অনুযায়ী নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি/ভিডিও বা সহিংস বিজ্ঞাপন চালানো নিষেধ। কিন্তু নির্বাচনের সময় স্বাধীন সমীক্ষায় দেখা যায়, সহিংসতা ও ভুয়া তথ্য থাকা সত্ত্বেও ১৫টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ১৩টিই মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রচারের অনুমোদন দিয়েছিল।

ব্রাজিলে দেশের বাইরের অর্থায়নে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো নিষেধ। তা সত্ত্বেও মেটা বিদেশ থেকে টাকা দেওয়া ১,৬০০-র বেশি বিজ্ঞাপন চলতে দিয়েছে। এমন কিছু বিজ্ঞাপনে ভুয়া খবর দিয়ে বলা হয়েছিল ‘অনলাইনে ভোট দেওয়া যাবে’, যা ব্রাজিলে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

লুলার পার্টির সদস্যরা অভিযোগ করেন, মেটা তাদের পোস্টের অর্গানিক রিচ কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে তাদের প্রচারের জন্য মেটাকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে পোস্ট 'বুস্ট' করতে হচ্ছে।

ব্রাজিলের সাও বার্নার্দো দো কাম্পোতে রোববার (২৫ অক্টোবর) দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর সমর্থকদের অভিবাদনে সিক্ত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।  ছবি: রয়টার্স
ব্রাজিলের সাও বার্নার্দো দো কাম্পোতে রোববার (২৫ অক্টোবর) দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর সমর্থকদের অভিবাদনে সিক্ত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: রয়টার্স

 

 

ব্রাজিলের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলার কথা থাকলেও মেটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উচ্চ নির্বাচনী আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিল লুলার দল। সবচেয়ে বড় কথা হলো ‘লুলার ফৌজ’ নিজস্ব নেটওয়ার্কে সরাসরি একে অপরকে বার্তা পাঠিয়ে এবং পাড়া-মহল্লায় নেমে অ্যালগরিদমের বাধা ভেঙে দিয়েছিল।

বোলসোনারো শিবিরের আত্মঘাতী ভুল

লুলার দল যখন দিনরাত এক করে মাঠ গোছাতে ব্যস্ত, ফ্লাভিও বোলসোনারোর শিবির তখন মারাত্মক কিছু ভুল করে বসে। সাধারণ ও সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা তাদের এই আচরণে ক্ষুব্ধ হন।

আরমান্দো আলভারেস পেন্তিয়াদো ফাউন্ডেশনের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক ভিনিসিয়াস জি রদ্রিগেস ভিয়েইরা জানান, প্রথম দফায় এগিয়ে গিয়ে সময়ের আগেই নিশ্চিত বিজয়ের আনন্দে মেতেছিলেন ফ্লাভিও। প্রথম দফার পরের সপ্তাহেই তিনি নিজেকে বিজয়ী ধরে নিয়ে আচরণ শুরু করেন। প্রকাশ্যেই নিজের সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করতে থাকেন। ব্রাজিলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন প্রকাশ্য অহংকারকে মানুষ ভালো চোখে দেখে না। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের চড়া মাশুল দিতে হয়েছে বোলসোনারো পরিবারকে।

 

সিনেটর ফ্লাভিওর নিজস্ব ক্যারিশমার বড় ঘাটতি ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষক গুস্তাভো রিবেইরো। নিজস্ব কোনো দূরদর্শী চিন্তার বদলে কেবল বাবার নামের ওপর ভর করে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন তিনি। লুলা যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে ছুটে গেছেন, ফ্লাভিও তখন সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়ে বসেছিলেন। লুলার কর্মীরা এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগায়।

জয়ের আসল সমীকরণ

৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবরের ব্যবধানে ভোটারের আচরণের পরিবর্তনই চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটে উপস্থিতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৮ শতাংশে। প্রথম দফার চেয়ে এই হার প্রায় দুই শতাংশ বেশি ছিল। ভোট না দেওয়ার হার ২১ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ১৯ শতাংশে নেমে আসে।

রিও ডি জেনিরো ফেডারেল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলি জানান এই বাড়তি ভোটই লুলার জয় এনে দিয়েছে। প্রথম দফায় ঘরে বসে থাকা ভোটারদের বিশাল অংশ দ্বিতীয় দফায় ভোটকেন্দ্রে ছুটে আসেন। প্রথম দফায় বোলসোনারোকে ভোট দেওয়া কিছু সাধারণ মানুষও দ্বিতীয় দফায় সিদ্ধান্ত বদলে লুলাকে ভোট দেন। লুলা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার ভোট। বিপরীতে ফ্লাভিও পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার ভোট।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা এবং রয়টার্স