ইউরোপের অন্তত ৯টি দেশে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতিবাদে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, গ্রিস, জার্মানি, আলবেনিয়া ও অস্ট্রিয়ায় তরুণ ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমেছেন।
বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি উত্তাল ফ্রান্স। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ফ্রান্সের লিমোজ শহরের ঐতিহ্যবাহী সিটি হল ধ্বংস হয়ে গেছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলে সিটি হলটি প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে টিকে ছিল।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। এর পর থেকে বিক্ষোভ জোরদার হতে থাকে।
অন্যদিকে আলবেনিয়ায় গ্রীষ্মকাল থেকেই আন্দোলন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়েজামাই জ্যারেড কুশনারের সমর্থনে নেওয়া একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়।
ফ্রান্স থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের উত্তাপ : ফ্রান্সে ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়।
লিমোজেস ও মার্সেইতেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিক মারিন ল্য পেন অভিবাসনকে কেন্দ্র করে বক্তব্য দেন। তবে আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এইচইসি প্যারিসের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নোর মতে, ফ্রান্সের আন্দোলন ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিক্ষোভের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ। শিক্ষা খাতে অর্থের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে অভিন্ন ক্ষোভ তৈরি করেছে।
ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় সহিংস পরিস্থিতি : ইতালিতে ১৬ অক্টোবর ‘নো মেলোনি ডে’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে বাজেট কমানোর প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষোভ দেখা দেয়। রোম ও তুরিনে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করে প্রতিবাদ জানান। ১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে এবং ব্যারিকেডে আগুন দেয়।
বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই ও অতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভের সময় ঘটা সহিংসতার নিন্দা জানান।
আলবেনিয়ায় আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও সরকারের প্রতি অসন্তোষ। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে ১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে হাজারো তরুণ বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে।
এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরেও ক্ষোভ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলেও এদি রামা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য আন্দোলনকে ব্যবহার করছে।
আবাসনসংকট তরুণদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে : স্পেন ও পর্তুগালে বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ আবাসনসংকট। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি এবং আয়ের তুলনায় আবাসনের ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। গ্রিসে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাড়তি অর্থায়নের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। আলবেনিয়ায় তরুণরা দুর্নীতিবিরোধী বড় ধরনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে; তারা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলেছে।
২৭ বছর বয়সী সাশা কোসি, যিনি কনসার্ট মঞ্চে সহকারী হিসেবে কাজ করেন, মঙ্গলবার মাদ্রিদের কেন্দ্রে তাঁবু গেড়ে থাকা একদল তরুণ স্প্যানিশের সঙ্গে বসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যত্হীন প্রজন্মের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।’
কোসি জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে টিকে থাকা এই ‘তাঁবু-শহর’ ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক তীব্র হতাশার প্রতিফলন। এই হতাশার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, স্বল্প বেতন ও আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মুখে অসহায়ত্ব, কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আগের প্রজন্মের ভোগ করা উদার সামাজিক কল্যাণমূলক সুবিধাগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সব কিছুতেই ক্লান্ত। পরিস্থিতি এমনভাবে পাল্টাচ্ছে, যা আমাদের কোনো উপকারে আসছে না।’
বিক্ষোভকারীদের এই হতাশা এমন একটি মহাদেশের চিত্র তুলে ধরে, যা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউরোপের মানুষ বয়স্ক হয়ে পড়ছে; পেনশন ও অন্যান্য কর্মসূচির ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকারগুলোর ঋণের বোঝা বাড়ছে,
অথচ তারা কর বাড়াতেও অনিচ্ছুক। অভিবাসন ইস্যুটি ভোটারদের মধ্যে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি এমন যে অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ইউরোপ ব্যর্থ হচ্ছে। একই সঙ্গে আমেরিকা ও চীনের মতো বিশ্বের দুই পরাশক্তির লড়াইয়ের মাঝে আটকা পড়েছে ইউরোপ। রাশিয়ার আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি ইউরোপীয় মিত্র ডেনমার্কের ভূখণ্ডে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি এখন ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।
এই সংকট ইউরোপের সব বয়সী মানুষকে প্রভাবিত করলেও তরুণ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন। কয়েক দশক ধরে ইউরোপীয় সমাজের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত সরকারি পরিষেবা ও সুযোগ-সুবিধাগুলো ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
ইতালির ডানপন্থী নেতা, স্পেনের বামপন্থী নেতা কিংবা ফ্রান্সের মধ্যপন্থী নেতা—সব আদর্শের সরকারই এই পরিস্থিতির কোনো কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইউরোপের তরুণরা ক্রমে অনুভব করছে যে তাদের কোনো গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না।
পাদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ও বিক্ষোভকারী ২২ বছর বয়সী স্টেলা সালিস বলেন, ‘এখানে এক ধরনের প্রত্যাখ্যান ও ক্লান্তির অনুভূতি কাজ করছে।’
এগুলো এখন বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে শুরু করেছে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একটি আন্ত সীমান্ত বা আন্তর্জাতিক আন্দোলনের বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা বেলজিয়ামের কিশোর-কিশোরীদের অনুপ্রাণিত করেছে; আবার ইতালি ও জার্মানির বিক্ষোভকারীরা এমন একটি স্লোগান ব্যবহার করতে শুরু করেছে, যার উৎপত্তি ফ্রান্সে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থানের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইউরোপে চরম ডানপন্থীদের উত্থানের সুযোগ : এই সম্ভাব্য উত্থানের পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, তা হলো :
অভিবাসন ও নিরাপত্তাসংকট : মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থী ও অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের অভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার মান হ্রাস : উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশা ডানপন্থী দলগুলোকে শক্তিশালী করছে।
মূলধারার রাজনীতির প্রতি মোহভঙ্গ : ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ভোটাররা বিকল্প হিসেবে উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা : গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন এবং বহুজাতিক সংস্কৃতির প্রভাবে নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতি, ধর্ম ও ঐতিহ্য হারানোর ভয় থেকে অনেকে ডানপন্থী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকছেন।
সামাজিক মাধ্যম ও প্রচার : অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (যেমন এক্স বা টুইটার) এবং নির্দিষ্ট গণমাধ্যমের অপপ্রচার ও অভিবাসনবিরোধী মনোভাব উসকে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপে চরম ডানপন্থীদের উত্থানের নেপথ্যে : ইউরোপে চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বেলজিয়ামের রাজনৈতিক দল ফ্লেমিস ইন্টারেস্টের উদ্যোগে ব্রাসেলসের দক্ষিণাঞ্চলে গত ২ সেপ্টেম্বর কিছু বেলজিয়ামের নাগরিক ইসলাম ও অভিবাসনবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ করে। আবার ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইতালির নির্বাচনে জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন চরম ডানপন্থী ব্রাদার্স অব ইতালি দল বিজয়ী হয়ে মধ্য-ডানপন্থী কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। ব্রাদার্স অব ইতালি একটি চরম ডানপন্থী ও নব্য ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত।
এদিকে ইউরোপের অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ডের সংসদেও চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতালি, স্পেন, হাঙ্গেরিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী পপুলিস্টদের মিছিল ও কর্মসূচি সাধারণত সংবিধান লঙ্ঘনের দিকে এগোচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাথিজ রুডুইজনের মতে, ইউরোপে চরম ডানপন্থী রাজনীতির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গত বছরের ৩১টি দেশের জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ ইউরোপীয় ভোটার মূলধারার রাজনৈতিক দলের বাইরে ভোট দিয়েছেন। একবিংশ শতকের শুরুর দিকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২০ শতাংশ, আর গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি তিনজনের একজন ইউরোপীয় ভোটার মূলধারার রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে চরম ডানপন্থী বা অন্য বিকল্প শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। ভোটারদের এই পরিবর্তনের একটি বড় অংশই চরম ডানপন্থীদের পক্ষে চলে যাচ্ছে।