গত ১২ অক্টোবর ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে পদযাত্রা করেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। হাজার হাজার সমর্থকের সেই মিছিলে রাহুল গান্ধী তাঁর সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে ভরসা খুঁজছিলেন।
একপাশে ছিলেন তাঁর ৫৪ বছর বয়সী ছোট বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। রাহুল তাঁকে নিজের সেরা বন্ধু এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী মনে করেন। অপর পাশে ছিলেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। কয়েক মাস আগেও কলেজ প্রাঙ্গণের বাইরে তাঁর নাম খুব কম মানুষই জানত।
টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাম্প্রতিক সময়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। দেশজুড়ে প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির পর তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন মোদি। ভোটার তালিকা পরিবর্তন করে প্রায় ১৩ কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে আবারও বিজেপি সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এই আন্দোলন।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেত্রী নেহা বোরা খুব দ্রুত মোদির ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তরুণ প্রজন্মের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। আন্দোলনের মধ্যে বেশ কয়েকবার নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার চতুর কৌশলে খবরের শিরোনাম হয়েছেন নেহা।
প্রযুক্তিবিদেরা নেহাকে জনপ্রিয় ভিডিও গেম মারিওর মতো চরিত্রে রূপ দিয়েছেন। সেই গেমে নেহার চরিত্র পুলিশের ব্যারিকেড টপকে দৌড়ায় এবং ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে। সামাজিক মাধ্যমে নেহার দ্রুতগতির দৌড়ানোর ভিডিওগুলো ভাইরাল গান ও অ্যানিমেশন ক্লিপে ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ানো তাঁর এসব ভিডিও কোটি কোটি তরুণ দেখছেন।
দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে গণতন্ত্রের দেবী বলে ডাকতে পারি? হংকংয়ের বেইজিংবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী অ্যাগনেস চৌ-কে একসময় এই উপাধিতে ডাকা হতো।’
তবে নেহা নিজে এই ধরনের কোনো অতিমানবীয় তুলনা পছন্দ করেন না। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আন্দোলনের একজন সাধারণ কর্মী মনে করি।’
‘গেরিলা কৌশল’ ও আন্দোলনের ইতিহাস
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) থিয়েটার বিষয়ে ডক্টরেটোত্তর (পোস্টডক্টরাল) পর্যায়ের শিক্ষার্থী নেহা। প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দশক ধরে ভারতের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
জেএনইউ প্রাঙ্গণেই নেহা যোগ দেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনে (আইসা)। সংগঠনটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নেহা। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে ককরোচ কর্মীদের সঙ্গে টানা কয়েক সপ্তাহের অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।
চলতি মাসের শুরুতেই নেহা জাতীয় রাজনীতির মূল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার তরুণের সমাবেশ করার কথা ছিল। সমাবেশ ঠেকাতে পুরো রাজধানীর কেন্দ্রস্থল বন্ধ করে দেয় মোদি সরকার।
পুলিশ ট্রেন ও বাসে আসা আন্দোলনকারীদের আটক করে। ছাত্রনেতাদের নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দি করা হয়। বিমানে করে দিল্লিতে নামামাত্র ককরোচ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের রানওয়ে থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। নেহা গোপনে পুলিশের নজরদারির বাইরে চলে যান।
সেদিন বিকেলে দক্ষিণ দিল্লির বিলাসবহুল এলাকায় নেহাকে দেখা যায়। তাঁর পরনে জাপানি অ্যানিমে কার্টুন ‘ওয়ান পিস’-এর টি-শার্ট, যা বিশ্বজুড়ে জেন জি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ব্যারিকেড দেওয়া এলাকা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে কয়েকশো তরুণকে নিয়ে তিনি মিছিল শুরু করেন।
আধা ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ এসে নেহাকে ঘিরে ফেলে। টেনেহিঁচড়ে তাঁকে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয় এবং অনেক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়। নেহার এই আন্দোলনের ধরন বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন হিসেবে ১৯৯০ সালের আগস্টে আইসার যাত্রা শুরু। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ থেকে এই পার্টির জন্ম হয়।
রাষ্ট্রের কঠোর দমনপীড়নের মুখে দীর্ঘ তিন দশক দলটি কাজ চালিয়ে যায়। ১৯৯০-এর দশকে সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ ছেড়ে দিয়ে দলটি মূলধারার সংসদীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়। দলটির পুরোনো কিছু ঐতিহ্য এখনো কর্মীদের আচরণে টিকে আছে। পুলিশ আগাম অভিযান চালাবে বুঝতে পেরে আইসার কর্মীরা ১০ অক্টোবর নেহাকে নিরাপদে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা এবং নেহার বন্ধু দানিশ আলী বলেন, ‘আমাদের দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে বহু বছর গোপন দল হিসেবে কাজ করেছে। আমরা সেই পুরোনো দিনের গেরিলা কৌশল অনুসরণ করেছি।’
দানিশ আলী জানান, ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশদের ফাঁসিকাঠে যাওয়া বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের পথেই তারা এই প্রতিরোধ চালাচ্ছেন।
ভগৎ সিংকে সর্বস্তরের মানুষ জাতীয় বীর হিসেবে শ্রদ্ধা জানালেও মোদির বিজেপি দল বাম রাজনীতিকে সবসময় কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। নেহার মতে, বামপন্থীদের দেখে বিজেপি সরকার ভয় পায়। আল জাজিরাকে নেহা বলেন, ‘ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল গৌরবময় সংগ্রামী ঐতিহ্যের হাত ধরে। সেই ধারার উত্তরসূরিদেরই যদি আপনারা অস্বীকার করেন, তবে কীভাবে নিজেদের দেশপ্রেমিক বলে দাবি করবেন?’
পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব
ভারতের উত্তরাখণ্ডের খাতিমা নামের ছোট শহরে নেহার জন্ম। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব কেটেছে জম্মু, বেঙ্গালুরু, অমৃতসর এবং লক্ষ্ণৌতে।
কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে নেহার মতাদর্শিক দূরত্ব তৈরি হয়। একপর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক মাস আগে যন্তর মন্তরের খোলা রাস্তায় শিক্ষার্থীদের সমর্থনে টানা ২৩ দিন অনশন করেন নেহা।
অনশনের একপর্যায়ে হাজার হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে নেহার পাশে এসে বসেন তাঁর মা। করেন সন্তানের দুই পায়ে হাত বুলিয়ে মালিশ। ওই অনশন নেহাকে দেশজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়। আইসার জ্যেষ্ঠ নেতা এন সাই বালাজি বলেন, ‘মোদি সরকারের মিথ্যা আশ্বাসে প্রতারিত হওয়া দেশের মধ্যবিত্ত তরুণরা নেহার মতো নিঃস্বার্থ নেত্রীর মধ্যে নতুন আশা খুঁজে পেয়েছে। দেশবিরোধী তকমা দেওয়া মানুষেরাও রক্তমাংসের মানুষ, সেই সত্য সবার সামনে প্রকাশ পেয়েছে।’
ক্যাম্পাস থেকে রাজপথের রাজনীতি
গণমাধ্যমের ক্যামেরা হয়তো নেহার দিকে নতুন করে ঘুরেছে, তবে রাজনৈতিক আন্দোলনের ময়দানে তিনি বহু বছর ধরে লড়ছেন। ২০১৯ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন নেহার রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড় ছিল।
সেই আন্দোলনের পর থেকে তিনি নিয়মিত ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে আসেন। জেএনইউ ক্যাম্পাসে তিনি বছরের পর বছর লিফলেট বিলি করেছেন, ছাত্রছাত্রীদের কক্ষে গিয়ে সংগঠনের জন্য ভোট চেয়েছেন।
নেহা সবসময় রাজনীতি নিয়ে ভাবেন। বিনা বিচারে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে জেলে বন্দি থাকা ওমর খালিদ ও শারজিল ইমামের মতো মুসলিম তরুণ বন্দিদের মুক্তির দাবিতে তিনি সবসময় সরব ছিলেন।
১০ অক্টোবর এবং পরের এক সপ্তাহে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সমর্থকদের নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছেন নেহা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে নেহার নতুন নতুন ছবি ছড়িয়ে পড়ত। পুলিশের শক্ত হাতের বাঁধন ভেঙে হাসিমুখে ভি-চিহ্ন দেখাচ্ছেন, কখনো নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁকে চ্যাংদোলা করে গাড়িতে তুলছেন।
বন্ধুরা জানান, পুরোনো প্রজন্মের তাত্ত্বিক ও জটিল ভাষায় কথা বলা বাম নেতাদের মতো নন নেহা। সাই বালাজি মনে করিয়ে দেন, ইন্টারনেটের যুগে বড় হওয়া নেহা তরুণদের ভাষা ও মানসিকতা খুব ভালো বোঝেন।
ভারতে বাম রাজনীতির সীমাবদ্ধতা ও নেহার ভবিষ্যৎ
জনপ্রিয়তা বাড়লেও ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে বাম ছাত্রনেতাদের বড় বাধার মুখোমুখি হতে হয়। আইসার প্রভাব মূলত উত্তর ভারতের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। তাদের মূল দল সিপিআই(এম-এল) লিবারেশন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ছোট দল।
সংসদে দলটির দুজন সংসদ সদস্য রয়েছেন এবং উভয়েই বিহারের। দলটি নিজ শক্তিতে কখনো কোনো রাজ্য সরকার গঠন করতে পারেনি।
দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক অসীম আলী বলেন, ‘ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ নির্বাচনী এলাকাগুলোতে অবস্থান তৈরির মতো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ আইসার নেই।’
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকতে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক শক্ত ঘাঁটি ও স্থায়ী ভোটার প্রয়োজন হয়। নেহার পেছনে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নিজস্ব ভোটব্যাংক তৈরি হয়নি। অনেক বাম নেতার মতো নেহাও ভবিষ্যতে কংগ্রেসের মতো মূলধারার বড় দলে যোগ দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে আসতে পারেন।
দলীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে নেহা তরুণদের মনে এক আবেদন তৈরি করতে পেরেছেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নিশিতা নাথ আইসার সদস্য না হয়েও নেহার ভক্ত। রাজপথে মিছিলের সময় নেহার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে নিশিতা প্রতিদিন সকালে অনুশীলন করেন। নিশিতা বলেন, ‘নেহার কথা বলার ভঙ্গি আর সাহস আমাকে মুগ্ধ করে।’
বিশ্লেষক অসীম আলীর মতে, নেহা সাময়িক ঘটনা নন। ভারতীয় রাজনীতির শূন্য জায়গায় তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন এবং টিকে থাকতে এসেছেন।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা