রাশিয়ার ওপর কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কারণ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, মস্কোকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার টেবিলে ধরে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেছেন, ‘রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের অবসান নিয়ে আমি আলোচনা করছি। এমন কিছু করতে চাই না, যা বোকামির মতো রাশিয়াকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।’
শুক্রবার রাতে রাশিয়ার ওপর বেশ কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়া ঠেকিয়েছেন ট্রাম্প। নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এর দুই দিন পর। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ যখন আরও গভীর হচ্ছিল, তখনই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
রবিবার এনবিসি নিউজকে জেলেনস্কি বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষ নেওয়া হবে ‘ঐতিহাসিক ভুল’। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ এটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সত্যিই ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেসে পাস এবং সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর করা ওই নিষেধাজ্ঞাগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ‘গুরুতর ক্ষতি’ করতে পারত। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, নিষেধাজ্ঞাগুলো ৬০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প জেলেনস্কির সমালোচনাও করেছেন। তিনি বলেছেন, জেলেনস্কি ‘এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না এবং সম্ভবত কখনোই চাননি’। দুই বছর আগে জেলেনস্কি এখনকার চেয়ে ‘আরও ভালো চুক্তি’ করতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।
তবে জেলেনস্কি যুদ্ধ বন্ধের জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর থেকেই তিনি বলে আসছেন, পুতিন শান্তি চান না। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য একটি বিতর্কিত চুক্তি করার পর ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারছে। এর বড় অংশ যাচ্ছে চীন ও ভারতে। অনেক ক্ষেত্রে ছাড়ের দামে এসব তেল বিক্রি করা হচ্ছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় অর্ধেক নিয়েছে চীন। আর প্রায় ৩৭ শতাংশ নিয়েছে ভারত।
ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার চুক্তির কথা জানানোর পর এবং পুতিনের তুলনায় জেলেনস্কিকে ‘বেশি কঠিন’ বলে মন্তব্য করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেছেন, ‘প্রকৃত নেতাদের’ মধ্যে থাকতে পেরে ভালো লাগছে।
রাশিয়ার যুদ্ধের খরচ চালানোর অর্থের উৎস কমাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞার জন্য বারবার চাপ দিয়েছেন জেলেনস্কি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের পর তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা।
জেলেনস্কি বলেছেন, এই চুক্তি কার্যত রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের সমান। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার পক্ষ নিচ্ছে—এমন আশঙ্কা আরও বেড়েছে ইউক্রেনে স্টারলিংকের সেবা ব্যাহত হওয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এই স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেবা ব্যাহত হওয়ায় রুশ হামলা থেকে নিজেদের রক্ষায় কিয়েভের সক্ষমতা কমে যায়।
জেলেনস্কি বলেছেন, স্টারলিংকের গতি কমানোর কারণ হিসেবে মার্কিন কর্মকর্তারা কারিগরি সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তবে তার দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে ইউক্রেন স্টারলিংক পরীক্ষা করে দেখেছে এবং সেখানে এটি বেশি গতিতে কাজ করেছে।
তবে ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে স্টারলিংকের গতি কমানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করেছে—জেলেনস্কির এই অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
সূত্র : বিবিসি