ভারতে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হস্তক্ষেপও বেড়েছে।
বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নামে গড়ে ওঠা যুব আন্দোলনের নেতৃত্বে বিক্ষোভগুলোতে পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
কোথাও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা ও কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, কোথাও হয়েছে ধরপাকড়।
বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে আটক এবং চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও।
অক্টোবরের বিক্ষোভে গণগ্রেপ্তার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ইতোমধ্যে একাধিক মামলা হয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় বলপ্রয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।
এক প্রতিবেদনে রয়টার্স লিখেছে, ভারতে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের হাতে নানা ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ভারতের সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত। তবে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কখন বলপ্রয়োগ করা যাবে, কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে এবং আটক করার ক্ষেত্রে কী নিয়ম মানতে হবে—সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পুলিশি নির্দেশিকা এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর কোথায় এবং কীভাবে পুলিশি বাড়াবাড়ি ঘটছে।
২০২৬ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতে ১৮ হাজার ৬২৯টি বিক্ষোভ-সমাবেশের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২০০টি বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করেছে পুলিশ। গ্রাফিক্স: রয়টার্স
যেভাবে বেড়েছে বিক্ষোভ
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতে মোট ১৮ হাজার ৬২৯টি বিক্ষোভ-সমাবেশের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে ১৭ হাজার ৬৯১টি ছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি, যার বেশিরভাগই ছিল শান্তিপূর্ণ। সহিংস বিক্ষোভ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে ৬৮৭টি ঘটনাকে।
এর মধ্যে অন্তত ১ হাজার ২০০টি বিক্ষোভে পুলিশ হস্তক্ষেপ করেছে।
২০১৬ সালে ভারতে বিক্ষোভ-সমাবেশের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৪২। আর ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২২ হাজার ১৩০-এ পৌঁছায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের অগাস্টে ২ হাজার ৫০০টির বেশি বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। ওই মাসে ২০০টির বেশি ঘটনায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা এক মাসে এমন ঘটনার এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা।
রাজ্যভেদেও বিক্ষোভের চিত্রে পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০১৬ সালে তেলেঙ্গানায় বিক্ষোভ-সমাবেশের সংখ্যা ছিল ৯৮টি। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ৩২৪ ছাড়িয়েছে। তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশেও বিক্ষোভের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে ‘ককরোচ’ যুব আন্দোলনের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স/আদনান আবিদি
কখন বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করতে পারে পুলিশ
ভারতের আইন ও পুলিশের জন্য প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে শুধু বিক্ষোভ হচ্ছে—এ কারণে নির্বিচারে বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই।
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রথমে ব্যারিকেড দিতে পারে। সতর্কবার্তা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে সরে যেতে অনুরোধ করতে পারে। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ভারতে বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর নির্ধারিত পোশাক ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল আতঙ্কের মধ্যে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
জুলাইয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে ‘ককরোচ’ যুব আন্দোলনের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স/অনুশ্রী ফড়নবিশ
কোনো বিক্ষোভে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে বোঝানো ও সতর্ক করা, এরপর প্রয়োজন হলে ন্যূনতম মাত্রার বলপ্রয়োগ এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা বন্ধ করা—এটাই নির্দেশনার মূল কথা।
যারা আইনসম্মত নির্দেশের পরও সমাবেশস্থল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাবেন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের আটক করা যেতে পারে। তবে সেই আটকও আইন মেনে করতে হবে।
ভারতের পুলিশের জন্য ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত আচরণবিধিতে জাতিসংঘের ন্যূনতম বলপ্রয়োগের নীতির প্রতিফলন রয়েছে। ২০১১ সালে বিক্ষোভ মোকাবিলায় অহিংস ব্যবস্থা ব্যবহারের জন্য প্রণীত মানসম্মত পরিচালনাপদ্ধতি (এসওপি) এবং ২০১৬ সালে পুলিশের গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যুরোর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এসব নীতির কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা পুলিশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
বিক্ষোভ দমনের নানা কায়দা
১. ব্যারিকেড: প্রথম প্রতিরোধব্যবস্থা
বিক্ষোভকারীদের চলাচল সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট এলাকা ঘিরে রাখার জন্য ব্যারিকেড ব্যবহার করা হয়। নিষেধাজ্ঞাধর্মী কোনো আদেশ কার্যকর থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যারিকেড অতিক্রম করাকে পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে ব্যারিকেড ভাঙা বা উপড়ে ফেলার মত ঘটনাও সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ কী ব্যবস্থা নেবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইন ও পরিস্থিতির ওপর।
২. চিরচেনা লাঠিপেটা
দক্ষিণ এশিয়ায় বিক্ষোভ দমাতে বহুল পরিচিত পদ্ধতি লাঠিপেটা। ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা এই ব্যবস্থায় আগে বাঁশের লাঠি ব্যবহৃত হলেও এখন পুলিশ পলিকার্বনেটের লাঠিও ব্যবহার করে।
ভারত সরকারের খাতায় ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লাঠিপেটার ঘটনায় ৬৬ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
এ বছর জুলাইয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় নারী বিক্ষোভকারীদের লাঠি দিয়ে আঘাত করার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় জরুরি পরিস্থিতিতে লাঠির আঘাত হাত ও পায়ের দিকে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। মাথা, ঘাড়, মেরুদণ্ড ও পেটের মত সংবেদনশীল স্থানে আঘাত করলে গুরুতর জখম হতে পারে। কাউকে ঘাড় ধরে রাখার কারণে শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০২০ সালে কৃষি আইনের প্রতিবাদে দিল্লির কাছে সিংঘু সীমান্তে কৃষকদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স/অনুশ্রী ফড়নবিশ
৩. জলকামান: গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি
জলকামানের মাধ্যমে কখনো কম চাপে পানি ছিটিয়ে বিক্ষোভকারীদের ভিজিয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনো উচ্চচাপের পানির প্রবাহ দিয়ে তাদের পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ভারতে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে ‘বরুণ’ নামের জলকামান ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
তবে উচ্চচাপের পানির প্রবাহ চোখের ক্ষতি ও কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার মত গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি থাকে। পানির সঙ্গে রাসায়নিক মেশানো হলে শ্বাসকষ্ট ও ত্বকে জ্বালাপোড়াও হতে পারে।
জুলাইয়ে ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকদের বিক্ষোভের সময় দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদুনে গ্যাসের ক্যানেস্তারা ছুড়ছেন র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) এক সদস্য। ছবি: রয়টার্স/অনুশ্রী ফড়নবিশ
জুলাইয়ে ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকদের বিক্ষোভের সময় দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদুনে গ্যাসের শেল ছুড়ছেন এক পুলিশ সদস্য। ছবি: রয়টার্স/অনুশ্রী ফড়নবিশ
৪. কাঁদুনে গ্যাস: চোখ ও ত্বকে জ্বালা
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ চোখ ও ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে।
তবে কাঁদুনে গ্যাস সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ছোড়া উচিত নয়। বদ্ধ বা সীমিত জায়গায় এটি ব্যবহার করা বিপজ্জনক, কারণ সেখানে গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
রয়টার্স লিখেছে, ভারতে মূলত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন টিয়ার স্মোক ইউনিটে তৈরি কাঁদুনে গ্যাসের সরঞ্জাম ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ২১ অগাস্ট ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের সময় পেলেট গানের গুলিতে আহত সাহিল লোচাব শরীর থেকে বের করা গুলিগুলো দেখাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স/অনুশ্রী ফড়নবিশ
জুলাইয়ে দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের সময় পেলেট গানের গুলিতে আহত এক আলোকচিত্রী সাংবাদিকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন। ছবি: রয়টার্স/অনুশ্রী ফড়নবিশ
৫. পেলেট গান: বিতর্কিত অস্ত্র
পেলেট গান সাধারণত ১২ গেজের বন্দুক, যেখান থেকে ধাতব বা প্লাস্টিকের ছররা গুলি ছোড়া হয়। ভারতে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এই অস্ত্রের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়।
২০২০ সালে জাতিসংঘের নির্দেশিকায় ধাতব পেলেট ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়।
কাশ্মীরে পেলেটের আঘাতে গুরুতর জখমের ঘটনার পর ২০১৬ সালে ভারতেও এ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আলোচনা হয়েছিল। বিকল্প ব্যবস্থার সুপারিশ করা হলেও পেলেট গান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত তখন নেওয়া হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেলেট গান নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিবেচনাধীন।
২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর দিল্লিতে নতুন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় রাইফেলে গুলি ভরছেন দাঙ্গা পুলিশের এক সদস্য। ছবি: রয়টার্স/আদনান আবিদি
২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর দিল্লিতে নতুন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন দাঙ্গা পুলিশের এক সদস্য। ছবি: রয়টার্স/দানিশ সিদ্দিকী
৬. আগ্নেয়াস্ত্র: একেবারে শেষ অবলম্বন
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, জীবন বা সম্পদের ওপর তাৎক্ষণিক গুরুতর বিপদ তৈরি হলে চরম পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এর আগে সতর্কবার্তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
গুলি ছোড়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্য নিচুতে রাখার নির্দেশনা রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলে গুলি চালানো বন্ধ করতে হবে। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ব্যবহৃত গোলাবারুদের হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে।
জুলাইয়ে দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভস্থলে রাখা নজরদারির গাড়ি ‘ইক্ষণ’। ছবি: রয়টার্স/ভাবিকা ছাবরা
জুলাইয়ে দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভস্থলে নজরদারি গাড়ির ওপর বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা। ছবি: রয়টার্স/ভাবিকা ছাবরা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর নজরদারি
ভারতে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। গত জুলাইয়ে দিল্লিতে যুব আন্দোলনের বিক্ষোভের সময় পুলিশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির জন্য বিশেষ গাড়ি ব্যবহার করেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সিপি প্লাসের ‘ইক্ষণ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থেকে অপরাধের ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং জনসমাগমের আকার পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা হয়।
অক্টোবরের বিক্ষোভে এ ধরনের গাড়ি দেখা না গেলেও ঘটনাস্থলে পুলিশের শরীরে লাগানো ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টি নজরে এসেছে।
দিল্লিভিত্তিক ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বিক্ষোভস্থলে এ ধরনের নজরদারি চালানোর পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি নেই এবং এ ধরনের কাজে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকার বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনস্বার্থ রক্ষার জন্য এসব ব্যবস্থা আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয়।
জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ অভিমুখে মিছিলের আগে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের ওপর নজরদারি করছেন এক পুলিশ সদস্য। ছবি: রয়টার্স/ভাবিকা ছাবরা
ইন্টারনেট বন্ধ, চলাচলে বাধা ও ধরপাকড়
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের আরেকটি পদ্ধতি হল মানুষের চলাচল সীমিত করা, যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিক্ষোভকারীদের আটক করা।
জুলাইয়ের যুব বিক্ষোভের সময় দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে টেলিযোগাযোগ কোম্পানিলোকে নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। বিক্ষোভস্থলের কাছাকাছি কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধও রাখা হয়েছিল।
অক্টোবরে আবারও মেট্রো চলাচল ও স্টেশন ব্যবহারে বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। আবেদনকারীদের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ছিল।
তবে ভারতের সলিসিটর জেনারেল দাবি করেন, মেট্রো পরিষেবা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলেছে।
১১ অক্টোবরের শুনানিতে আদালত গণগ্রেপ্তার বন্ধ করা এবং মেট্রো, রেল ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে নির্দেশ দেয়। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রয়োজনে আইনসম্মত বিধিনিষেধের সুযোগও রাখা হয়।
রয়টার্স লিখেছে, বিক্ষোভস্থলের বাইরে থেকেও লোকজনকে আটক করার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১০ অক্টোবর বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার আগে বিমানবন্দর থেকে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের দুই নেতাকে আটক করা হয়।
১১ অক্টোবরের শুনানিতে আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা এলাকার বাইর থেকেও পুলিশ লোকজনকে ‘তুলে নিয়ে গেছে’।
আদালত নির্দেশ দেয়, আইন অনুমোদন করে না—এমন কোনো আটক করা যাবে না। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকার বাইরে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আটক করার ক্ষেত্রে আইন মানতে হবে।
জাতিসংঘের একটি সংস্থা নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই আহ্বানকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং ‘পুলিশ আইন মেনেই কাজ করেছে’ বলে দাবি করে।
জুলাইয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং সেপ্টেম্বরে নির্বাচনি অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে বিক্ষোভেও কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলের সদস্যকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বেশির ভাগকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৪ অক্টোবর ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় পুলিশের হাতে আটক হন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা। ছবি: রয়টার্স/ভাবিকা ছাবরা
অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে তদন্ত
দিল্লিতে জুলাইয়ের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে সেখানে কাঁদুনে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করা হয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও অভিযোগ করা হয়, পুলিশ পেলেট গান, কাঁদুনে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠি ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ভারতের নিজস্ব নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দিল্লি পুলিশ অবশ্য বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র বা পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছে, অতীতে অপরাধে জড়িত ছিলেন–এমন কিছু ব্যক্তি বিক্ষোভে সহিংস হয়ে উঠেছিলেন।
এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জুলাইয়ে একটি কমিটি গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট।
অক্টোবরের বিক্ষোভে বলপ্রয়োগ ও আটকের অভিযোগ নিয়েও আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।






