Image description

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘যত্ন করে তৈরি করা’ ভাবমূর্তি ভেঙে দিয়েছে তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক তেলাপোকাদের (ককরোচ) আন্দোলন। এমন মন্তব্য করেছেন বুকারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, করপোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিপত্য দিয়ে মোদির যে ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন আর টিকছে না। তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সেই ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হেনেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ২৮ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ইমরান খানের নানা প্রশ্নের জবাব দেন ৬৪ বছর বয়সী এই লেখক। আলোচনায় উঠে আসে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জেন জেড-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ প্রসঙ্গ।

অরুন্ধতী বলেন, 'আমার মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ফুটছে। কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সম্রাটকে সবার সামনে উন্মোচন করা হয়েছে, তিনি তার ক্ষমতা হারিয়েছেন।' 

সিজেপি আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণরা অপমানকে শক্তিতে পরিণত করেছে। কাউকে ‘তেলাপোকা’ বলে গালি দেওয়ার পর সেই তকমাই তারা নিজেদের প্রতীকের মতো ধারণ করেছে। এই আন্দোলনের ভাষা আনন্দময়, রসিকতায় ভরা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত গুরুতর। ইনস্টাগ্রাম রিল ও ব্যঙ্গাত্মক ভিডিওর মাধ্যমে তারা যে বার্তা দিচ্ছে, তা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

লেখক তার প্রবন্ধ শুরু করেছিলেন একটি লাইন দিয়ে, 'যখন আশা হারিয়ে গিয়েছিল, তখন বৃষ্টিতে ভিজে এলো তরুণ তেলাপোকারা, এক বিচারক ও এক রসিকতার অনৈতিক মিলনের সন্তান'। এই পঙ্‌ক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এই আন্দোলন মোদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না বোঝার ফল কি না,  এমন প্রশ্নের জবাবে অরুন্ধতী বলেন, তা নয়। বিজেপিই ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনীতিতে প্রথম ঢুকেছিল। কিন্তু পরপর অনেক ঘটনা জমতে জমতে পরিস্থিতি বিস্ফোরণের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তার ভাষায়, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে, চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস হয়েছে, দেশে বেকারত্ব আকাশ ছুঁয়েছে। সব মিলে যে ক্ষোভ জমেছিল, সিজেপি ছিল তার বহিঃপ্রকাশ।

'এটা ছিল খড়ের গাদায় শেষ খড়কুটো, যা উটের পিঠ ভেঙে দিল,' বলেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে আধুনিক ভারতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অরুন্ধতী বলেন, 'আধুনিক ভারত হলো খুব ধনী একটি দেশ, যেখানে খুব খুব গরিব মানুষ বাস করে। বিশ্বে এমন কম দেশই আছে, যেখানে মানুষ এত গভীর দারিদ্র্য ও অপমানের মধ্যে বাস করে। ভারতকে পরাশক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তি বলা একটা কেলেঙ্কারি।'

তার মতে, মুষ্টিমেয় শিল্পপতি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের হাতেই সম্পদ কেন্দ্রীভূত, গরিবের কাছে তার সামান্যই পৌঁছায়।

অরুন্ধতী জানান, এই মুহূর্তে ভারতে নতুন করে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে। একটি সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের নির্বাচন পুরোপুরি আপসকৃত হওয়ার যে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উঠে এসেছে, তার প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে সিজেপি।

বহু বছর ধরে লেখক ও কর্মীরা যে অভিযোগ করে আসছিলেন, এখন তার বস্তুগত প্রমাণ মিলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী নিজের লেখক পরিচয় নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধতে চান না। ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক বা রাজনৈতিক কর্মী — এই বিভাজন পাঠকের জন্য, তার জন্য নয়। তার মতে, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে কোনো আলাদা দেওয়াল নেই। এমনকি রূপকথাও এক অর্থে রাজনৈতিক।

অরুন্ধতী রায় এর আগে গাজা নিয়ে মন্তব্যের জেরে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি থেকে সরে দাঁড়িয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। ভারতের রাজনীতি নিয়ে তার খোলামেলা সমালোচনা বরাবরই বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে এবারের তেলাপোকা আন্দোলনকে তিনি দেখছেন ভিন্ন চোখে — এটি কোনো দলীয় আন্দোলন নয়, বরং ক্ষমতার প্রতি তরুণদের নির্ভীক বিদ্রুপ।