ভারতে নতুন ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধনের জন্য যে ফর্ম ৬ পূরণ করতে হয়, সেটিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইসিআইনেট-এ ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত করা একটি অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সোমবার স্পষ্ট করে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তিত সংস্করণ অনুমোদন করেনি।
বিষয়টি সামনে আসে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে চলা মামলার সূত্রে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েকটি আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, এসআইআর-এর পদ্ধতি নির্ধারণে তিনি একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিতর্কের শুরু কোথায়?
২০২৫ সালের জুনে বিহারে এসআইআর শুরু করার সময় নির্বাচন কমিশন ফর্ম ৬-এর সঙ্গে ‘এনেক্সার ডি’ নামে একটি আলাদা ঘোষণাপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এতে আবেদনকারীর বয়স, বাসস্থান, নাগরিকত্ব এবং প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়।
বিহারের এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলে এই ঘোষণাপত্রও আদালতের সামনে আসে। ২৭ মে আদালত রায় দিয়ে এসআইআর পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা স্বীকার করে। একই সঙ্গে আদালত বলে, এমন একটি প্রক্রিয়ার জন্য কমিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী নথিপত্রের কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে সেই অতিরিক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে সঠিক ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির উদ্দেশ্যের যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে।
এরপর জুলাই মাসে নতুন একটি ঘোষণাপত্র চালু করা হয়। এতে নতুন ভোটারদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা নিজেরা, তাদের বাবা-মা অথবা দাদা-দাদি বা নানা-নানি আগের কোনও এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় ছিলেন কি না। থাকলে সেই পুরনো ভোটার তালিকার বিধানসভা কেন্দ্র, বুথ ও ক্রমিক নম্বরের মতো তথ্যও দিতে বলা হয়।
সমস্যা হলো, এই ঘোষণাপত্রটি আইনসিদ্ধ ফর্ম ৬-এর অংশ ছিল না। কিন্তু ইসিআইনেট-এ এটি পূরণ না করলে নতুন ভোটাররা আবেদন সম্পূর্ণ করতে পারতেন না। ফলে প্রশ্ন ওঠে—আইনে নির্ধারিত ফর্মের বাইরে এমন একটি অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ছিল কি না।
ফর্ম ৬-এর আইনি গুরুত্ব
ফর্ম ৬ সাধারণ কোনও প্রশাসনিক কাগজ নয়। এটি ভারতের নির্বাচনী আইনের অংশ। ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেকশন রুলস-এর ১৩ নম্বর বিধির অধীনে এই ফর্ম নির্ধারিত হয়েছে।
আবার রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল এক্ট, ১৯৫০-এর ২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়ম তৈরি করতে পারে। ভোটার নিবন্ধনের ফর্মও সেই নিয়মের অধীনেই নির্ধারিত হয় এবং সরকারি গেজেটে তা প্রকাশ করতে হয়। পরে এসব নিয়ম সংসদের সামনে পেশ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হলো, ফর্ম ৬-এ কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। এসআইআর-এর সময় অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি আলাদা একটি শর্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল।
তবে কমিশনের ভেতরেই এ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশি ১৬ মে এই ঘোষণাপত্র নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, এসআইআর-এর জন্য আলাদা করে তৈরি কোনও ফর্মের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ফর্ম ৬ ও ৮ যেহেতু আইন অনুযায়ী নির্ধারিত, তাই ১৯৬০ সালের বিধি সংশোধন না করে সেগুলো পরিবর্তন করা যায় না।
১৯ মে আরেক নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধুও তাঁর সঙ্গে একমত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এসআইআর-এর ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা কতটা?
এখানেই বিষয়টি কিছুটা জটিল। ১৯৫০ সালের আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন করতে পারে এবং সেই কাজ কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে কমিশনের যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে।
বিহারের এসআইআর-সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টও কমিশনের এই ক্ষমতা স্বীকার করেছে। আদালত বলেছে, এসআইআর-এর মতো বিশেষ প্রক্রিয়ায় কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত নথি বা তথ্য চাইতে পারে।
তবে এই ক্ষমতারও সীমা আছে। কমিশনের নেওয়া অতিরিক্ত কোনও ব্যবস্থা অবশ্যই ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল করার উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্তিসংগতভাবে সম্পর্কিত হতে হবে।
এই কারণেই নতুন ঘোষণাপত্রটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন ১৮ বছর বয়সী নতুন ভোটারের কাছে বহু বছর আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় নিজের বা পরিবারের সদস্যের নামের তথ্য থাকা বা সেই তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। ফলে এই তথ্য সত্যিই কতটা প্রয়োজনীয় এবং ভোটার হওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটা—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কমিশনের ভেতরের আপত্তি
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নথি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসিআইনেট-এ পরিবর্তন আনার পর ১৩ আগস্ট সান্ধু পোর্টালের এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত/অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি মূল ফর্ম ৬ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান, যাতে যোগ্য তরুণ ও প্রথমবারের ভোটাররা কোনও হয়রানি ছাড়াই নিবন্ধন করতে পারেন।
তবে এগুলো কমিশনারদের অভ্যন্তরীণ আইনি মতামত। এগুলো কোনও আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।
২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন দাবি করে, এসআইআর-এর জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্র সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেছে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিহারের মামলায় আদালতের সামনে যে ‘এনেক্সার ডি’ ছিল, সেটি ছিল আগের ঘোষণাপত্র। পরে যে ঘোষণাপত্রে নতুন ভোটার বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আগের এসআইআর তালিকার তথ্য চাওয়া হয়, সেটি আদালতের ওই রায়ের পর চালু হয়।
এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর এসআইআর শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলোতে ইসিআইনেট থেকে বিতর্কিত ঘোষণাপত্রটি সরিয়ে নেওয়া হয়। যেখানে এসআইআর তখনও চলছিল, সেখানে এটি রাখা হয়।
এখন আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন কী?
সুপ্রিম কোর্ট এখনও এই পরবর্তী ঘোষণাপত্রটি আইনসঙ্গত কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। আদালত সেই প্রক্রিয়ার নথি চেয়েছে, যার মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
আদালত মূলত জানতে চাইছে—ঘোষণাপত্রটি কে অনুমোদন করেছিলেন, এটি আলাদা এসআইআর-সংক্রান্ত নথি হিসেবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না, কীভাবে এটি ইসিআইনেট-এর বাধ্যতামূলক অংশ হয়ে গেল এবং কমিশনের ভেতরে ওঠা আপত্তিগুলো কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বক্তব্যের ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: সুপ্রিম কোর্ট ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তন অনুমোদন করেনি।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি শুধু একটি অনলাইন ফর্ম নিয়ে নয়। বিষয়টি হলো, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত একটি ফর্মের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন কতটা অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করতে পারে। নাগরিকের কাছে ইসিআইনেট-ই যখন ভোটার হওয়ার বাস্তব দরজা, তখন অনলাইন প্রক্রিয়ায় কোনও অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হলে তার স্পষ্ট আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। কেন সেই তথ্য প্রয়োজন, কোন আইনের ক্ষমতায় তা চাওয়া হচ্ছে এবং কে সেটির অনুমোদন দিয়েছে—নির্বাচন কমিশনকে এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর দিতে হবে।
সূত্র: স্ক্রল.ইন