Image description

মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধন চালানোর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। এখন রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যা-নিপীড়ন ও তাদের জমি দখল করছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি (এএ)। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং নিধনযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচা রোহিঙ্গাদের ভাষ্যে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের হত্যা করে তাদের ঘর-বাড়িসহ গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে বন্দিশালা ও সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে আরাকান আর্মি। ২০২৪ সালে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি (এএ) উত্তর রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এএ। হঙ্গেত থায় এলাকায় আগে যেখানে ধানক্ষেত ছিল সেখানে এখন আরাকান আর্মির ক্যাম্প। আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্যাম্পটির মতো আরও অন্তত ১০টি ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। রাজ্যের বহু রোহিঙ্গা এখন এখানেই বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যরা পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে লুকিয়ে রয়েছে কিংবা পালিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আশ্রয়শিবিরে চলে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ মালয়েশিয়ার যেতে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় পা বাড়াচ্ছে।

২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশে আরও ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। যা মিয়ানমারে এখনও অবস্থানরত আনুমানিক ৬ লাখ রোহিঙ্গার প্রায় ২৫ শতাংশ। জান্তা বাহিনীর পর আরাকান আর্মি, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করে চলেছে।

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, উত্তর রাখাইনের হয়্যার সিরি গ্রামে ঘটে যাওয়া এক গণহত্যার পর বেঁচে যাওয়া কিছু রোহিঙ্গাকে আরাকান আর্মি (এএ) জোর করে সরিয়ে এনেছিল হেঙ্গত থায় নামের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে। যেখানে তাদের অনেকেই এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নথি অনুযায়ী, সেই গ্রামে আরাকান আর্মির হাতে শত শত নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ২ হাজার একর জমি দখল করা হয়েছে। দখল করা জমিগুলোকে ক্যাম্প, অন্য গোষ্ঠীর বসতি কিংবা সামরিক অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কৌশলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন ওই এলাকা থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা তরুণ মুহাম্মদ আরিস। তিনি বলেন, “তারা পুরো এলাকা গুঁড়িয়ে দিতে বুলডোজার ব্যবহার করেছে, আমাদের গ্রামগুলোকে একেবারে সমতল ও ফাঁকা মাঠে পরিণত করেছে। সব গাছ কেটে ফেলেছে এবং আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি চিহ্ন মুছে দিয়ে কেবল অনুর্বর জমি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। যে এলাকাগুলোতে তারা আমাদের বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে তারা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিজেদের সামরিক ক্যাম্প ও বন্দিশালা স্থাপন করেছে।”

আরিসের মতো ২০২৪ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন সালামত খান। নিজ গ্রামে হামলার পর আরাকান আর্মির যোদ্ধারা তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। তিনি বলেন, “আরাকান আর্মি আমাদের বলেছিল ‘বাংলাদেশে চলে যাও, তোমাদের ঘরবাড়ি আর নেই, এবার ক্যাম্পে গিয়ে ওঠো’।”

২০২৪ সালের পর রাখাইনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা আরাকান আর্মি (এএ) দাবি করে তারা রাজ্যের সব নৃগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় লড়াই করছে। বাহ্যিকভাবে তারা রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলেও, বাস্তবে তাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পথ অনুসরণের অভিযোগ উঠেছে। জান্তাবাহিনী রোহিঙ্গাদের হত্যা করে তাদের জমিজমা ধ্বংস ও বাজেয়াপ্ত করেছিল।

গত বছর, জাতিসংঘ সমর্থিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’ (আইআইএমএম) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছিল এমন সাতটি গ্রামের তালিকা দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) চলতি অক্টোবরে সিদ্ধান্ত জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে আদালত “বাড়িঘর থেকে পরিকল্পিতভাবে বিতাড়ন এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করাকে” গণহত্যার একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমারে ইজারা বা লিজ ব্যবস্থার মাধ্যমে জমির মালিকানা নির্ধারিত হয়। দেশটির আইনে আগুনে পুড়ে যাওয়া ‘অব্যবহারযোগ্য’ জমি রাষ্ট্রের অধীনে চলে যায়। যা আসলে রোহিঙ্গাদের মালিকানা কেড়ে নেওয়ার পথ সহজ করে দেয়। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক মাত্রায় দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর ২০১৮ সালে পাস হওয়া আরেকটি আইনে বলা হয়, অনাবাদী জমি রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জমি পোড়ানো চিরস্থায়ী দখলের কৌশলের অংশ হয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যে।

মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিছুটা সময় লাগতে পারে, তবে আরাকান আর্মি ভেতরে ভেতরে এমনভাবে কাজ করছে যাতে সেখানে এই জনগোষ্ঠীর আর কোনো ভবিষ্যৎ না থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যতদিন সহ্য করতে পারে ততদিন পর্যন্ত চরম মানবেতর পরিস্থিতিতে এসব কারাগারের মতো ক্যাম্পে পড়ে থাকতে পারে। কিন্তু তাদের আর কখনো নিজ ঘরে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে না।’