Image description

ইসরায়েলের অধিকৃত পশ্চিম তীরে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির উগ্র ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ। তিনি বলেছেন, গাজায় ইসরায়েল যে ধরনের অভিযান চালিয়েছে, পশ্চিম তীরেও একই কৌশল প্রয়োগ করা উচিত।

 

রোববার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজকে স্মোত্রিচ বলেন, পশ্চিম তীরে চলমান ‘নিরাপত্তা উত্তেজনা’ মোকাবিলায় ইসরায়েলের উচিত সেখানে যুদ্ধ শুরু করা। আগামী মাসে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের আগে তার এই বক্তব্য সামনে এল।

 

স্মোত্রিচ বলেন, ‘আমাদের জুডিয়া ও সামারিয়ায় (পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি ব্যবহৃত নাম) যুদ্ধ শুরু করতে হবে। গাজায় যা করেছি, সেখানেও তা করতে হবে।’

 

তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দিতে হবে। তার ভাষায়, এটি একটি ‘সন্ত্রাসী কর্তৃপক্ষ’।

 

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শরণার্থীশিবিরগুলো ইসরায়েলি বাহিনী ‘পরিষ্কার করেছে’ উল্লেখ করে স্মোত্রিচ বলেন, গাজার মতো সেখানেও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবকাঠামো ধ্বংস করতে হবে।

 

তিনি বলেন, ‘যেভাবে গাজায় হামাসকে ধ্বংস করেছেন, সেভাবেই জুডিয়া ও সামারিয়ায় কোনো সন্ত্রাসী অবকাঠামো থাকতে দেওয়া যাবে না। কোনো সন্ত্রাসী, অস্ত্র বা সুড়ঙ্গ থাকবে না।’

 

মানবাধিকার সংগঠন আদালাহর আইন পরিচালক সুহাদ বিশারা স্মোত্রিচের বক্তব্যকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, স্মোত্রিচ শুধু পশ্চিম তীরে যুদ্ধের প্রস্তাব দিচ্ছেন না, তার ভাষ্য অনুযায়ী সেখানে ইতিমধ্যেই যুদ্ধ চলছে।

 

বিশারা বলেন, স্মোত্রিচ যেসব শরণার্থীশিবির ‘পরিষ্কার’ করার কথা বলেছেন, সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে।

 

তার দাবি, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের মতো পশ্চিম তীরেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রকাশ করে।

 

 

গাজার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবানন দখলের কথাও বলেছেন স্মোত্রিচ। তিনি বলেন, গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত এবং লেবাননে লিতানি নদী পর্যন্ত ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে নেওয়া উচিত।

 

স্মোত্রিচের ভাষ্য, গাজা ও লেবাননের কিছু অংশ দখল করলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার জন্য ইসরায়েলের শত্রুদের ‘মূল্য দিতে’ হবে।

 

ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জুনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সেখানে গোলাবর্ষণ ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

স্মোত্রিচের পশ্চিম তীর, গাজা ও দক্ষিণ লেবাননের ভূখণ্ড দখলের আহ্বানকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশারা। তার ভাষ্য, দখল করা ভূখণ্ড জোর করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং সেই দখল স্থায়ী করার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ।

 

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্মোত্রিচের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, এই বক্তব্য ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বাড়ানো এবং আরও অপরাধ সংঘটনের ‘স্পষ্ট আহ্বান’।

 

মন্ত্রণালয় বলেছে, স্মোত্রিচের বক্তব্য ইসরায়েলের সংযুক্তিকরণ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনার বিষয়টি প্রকাশ করে। এর ফলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা মন্তব্য করেছে।

 

পশ্চিম তীর নিয়ে স্মোত্রিচের বক্তব্য অবশ্য নতুন নয়। তিনি এর আগে পশ্চিম তীরের ৮০ শতাংশের বেশি ভূখণ্ড ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি তথাকথিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানেরও বিরোধিতা করে আসছেন।

 

চলতি বছরের জুলাইয়ে স্মোত্রিচ পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর আগে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা অধিকৃত পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলে ১৩টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমোদন দেয়। জুনে জেরুজালেমের কাছে একটি নতুন অবৈধ বসতিতে ২ হাজার ১৬২টি নতুন ইহুদি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছিল।

 

আগামী মাসের নির্বাচনি প্রচারণায় পশ্চিম তীরে আরও বসতি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন স্মোত্রিচ।

 

আদালাহর সুহাদ বিশারার মতে, সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং বসতি সম্প্রসারণের কারণে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো তাদের ভূমি থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসি নিয়েও স্মোত্রিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। গত মে মাসে তিনি দাবি করেন, আইসিসি তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার আদেশ, অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনে সমর্থন এবং গাজায় ফিলিস্তিনিদের খাদ্য থেকে বঞ্চিত করার পক্ষে বক্তব্য তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে।

 

গাজায় যুদ্ধবিরতির আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্মোত্রিচ গাজাকে একটি ‘রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সম্ভাবনাময় এলাকা’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন। সে সময় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করার কথা জানান। চলতি বছরের মার্চে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলকেও গাজার মতো করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।

 

নির্বাচনি বক্তব্য, নাকি বাস্তব পরিকল্পনা?

 

আগামী মাসের নির্বাচন সামনে রেখে স্মোত্রিচের বক্তব্যকে কেবল নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশারা। তার মতে, এসব বক্তব্যকে সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধ বন্ধে রাষ্ট্রগুলোর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

 

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইসরায়েল-ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশ্লেষক মাইরাভ জন্সজেইনও মনে করেন, স্মোত্রিচের বক্তব্যকে তার দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।

 

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, গত চার বছর পশ্চিম তীরে স্মোত্রিচ যা করে আসছেন, তার বক্তব্য তারই প্রতিফলন। ক্ষমতায় থাকলে তিনি সেই নীতি অব্যাহত রাখতে চান বলেও মনে করেন জন্সজেইন।

 

জন্সজেইন বলেন, স্মোত্রিচ, বর্তমান সরকার এবং তাদের সমর্থিত বসতি স্থাপনকারী আন্দোলন পশ্চিম তীরে ইতিমধ্যেই সংঘাতে জড়িয়ে আছে। বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া উসকে দিচ্ছে। এরপর ফিলিস্তিনিদের যেকোনো প্রতিক্রিয়ার জবাব আরও কঠোর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে।

 

চ্যাথাম হাউসের ইসরায়েল-ফিলিস্তিনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, স্মোত্রিচের বক্তব্য নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হতে পারে। তবে তার মতে, আজকের বক্তব্য আগামী দিনের নীতিতে পরিণত হতে পারে।

 

মেকেলবার্গ বলেন, নির্বাচনের এক মাস আগে যদি ভোটারদের সামনে এ ধরনের বক্তব্য তুলে ধরা হয় এবং এই মতাদর্শের কোনো ব্যক্তি আবার নির্বাচিত হন, তাহলে সেটিকে ওই ধরনের নীতির প্রতি সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।