যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নৌ-অবরোধ তুলে নিতে ৭ দিনের একটি ‘রোডম্যাপ’ বা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে ইরান। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে এই প্রস্তাবের রূপরেখা তুলে ধরেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ওয়াশিংটনের কাছে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ প্রায় সপ্তম মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালিতে ইরান কড়াকড়ি আরোপ করায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধস নেমেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র প্রভাব ফেলেছে।
ইরানের নতুন প্রস্তাবে গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্মত হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণে ৭ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হলো-
আগামী ৭ দিনের মধ্যে গাজা ও লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক সংঘাত সম্পূর্ণ বন্ধ করা। যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা ইরানের অন্তত ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা। ইরানি তেলের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং ওয়াশিংটনের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭ দিনের সময়সীমার শেষ দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। এর পরপরই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার কথা বলা হয়েছে- যে ইস্যুটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এর আগে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে আলোচনার জন্য ৬০ দিন সময় ধরা হয়। তবে পাল্টাপাল্টি হামলা ও নথির স্পষ্টতার অভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেস্তে যায় এবং ৭ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি বাতিল করেন। সম্প্রতি ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, যুক্তরাষ্ট্র আগের প্রতিশ্রুতিতে ফিরলে তেহরানও অবিলম্বে সাড়া দেবে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, “আমরা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই পরিকল্পনা জমা দিয়েছি।” অন্যদিকে হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ অব্যাহত রয়েছে। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ জানিয়েছে, তাড়াহুড়ো করে ওয়াশিংটন কোনো চুক্তিতে সই করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব উভয় দেশের কূটনৈতিক অচলাবস্থা স্পষ্ট করে। জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও রাজনীতির অধ্যাপক সাইরাস শায়েগ আল জাজিরাকে বলেন, মৌলিক অবস্থানগুলোতে তেমন পরিবর্তন হয়নি; ইরান জুনের সমঝোতায় ফিরতে চায় আর যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ বন্ধের বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি নির্বাচনের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি ওয়াশিংটনের নির্বাচনের সমীকরণ দেখে নির্ধারিত হবে না।