Image description

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইয়েমেন। দীর্ঘ সময়ের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর হুথি বাহিনী ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা, সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং এর জবাবে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর পাল্টা অভিযান- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সংঘর্ষের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এ সংঘর্ষে ইতোমধ্যে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবিক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে সতর্ক করেছে। এরই মধ্যে সৌদি আরব মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

কারণ, দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সংঘাতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

মোখা দখল থেকে নতুন সংঘাত
ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনার শুরু পশ্চিম উপকূলে হুথিদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তারা মোখা দখল করে। এই বন্দরনগরী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দাবের দিকে যাওয়া সামুদ্রিক করিডরের কাছাকাছি।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, হুথিদের অগ্রযাত্রার পর পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। মারিব, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, আল-বায়দা ও সাদাসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে পাল্টা অভিযান চালানোর খবর পাওয়া যায়।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে আসছে। অন্যদিকে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্ব বহু বছর ধরে সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক লড়াইয়ে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের কাছে হুথিদের অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য ইয়েমেনে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক ধাক্কাগুলোর একটি।

সৌদি তেল স্থাপনা ও বিকল্প নৌপথের ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বাড়ায় সৌদি আরবের তেল পরিবহনে বিকল্প পথের গুরুত্ব বেড়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নেওয়ার জন্য ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে এই বিকল্প ব্যবস্থাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
দক্ষিণ সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান এলাকায় হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ কয়েকটি হামলায় হতাহতের তথ্য জানিয়েছে। অন্যদিকে, হুথিরা নাজরানের শারুরাহ এলাকায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে।
হরমুজের বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরভিত্তিক রুট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইয়েমেনের হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বড় বিষয়। ফলে সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ থাকলেও তা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়।

মক্কা ঘিরে নতুন উদ্বেগ
সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি হলো মক্কাকে ঘিরে নিরাপত্তা সতর্কতা। সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, হুথিদের ছোড়া একটি ড্রোন মক্কার দিকে যাচ্ছিল এবং সেটি প্রতিহত করা হয়েছে। হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সৌদি দাবিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর প্রশ্নই আসে না। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্য করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। ফলে ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা দিয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ সংঘাতকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। কারণ, মক্কা মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। কোনো হামলা বা ভুল বোঝাবুঝি পরিস্থিতিকে আরও দ্রুত বিস্তৃত সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে- এমন আশঙ্কা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তেল ও সামরিক স্থাপনায় ইয়েমেনি মিসাইল ও ড্রোনের চরম চাপের মুখে পড়েই মূলত মক্কায় হামলার এই রাজনৈতিক গল্প সামনে আনা হয়েছে। একদিকে সৌদি রাজতন্ত্র ধর্মীয় আবেগকে কৌশলগত ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে হুথি বিদ্রোহীরা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সংযোগ তুলে ধরে প্রমাণ করছে যে, এটি তাদের সংঘাত থেকে বিশ্বজনমতের দৃষ্টি সরানোর একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক ও সামরিক ফন্দি মাত্র।

বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রাথমিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়েছে। অনেক মধ্যবর্তী অস্ত্রাগার ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যবহৃত হওয়ায় আমেরিকা এখন বাধ্য হয়ে ইসরায়েলের মাধ্যমে নতুন অস্ত্র বিন্যাস করছে এবং রিয়াদকে সামরিক তথ্য দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

বাব আল-মান্দাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক তাৎপর্য রয়েছে বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এটি।
এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সমুদ্রপথে চলাচলকারী বহু জাহাজ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের পশ্চিম উপকূলে অগ্রযাত্রা এবং গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ, এর ফলে লোহিত সাগরের প্রবেশপথের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

সৌদির সামনে কঠিন পরিস্থিতি
হুথিদের অগ্রযাত্রা সৌদির জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সরকারের বাহিনীগুলো পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সমস্যায় পড়েছে।
হুথিরা মোখাসহ পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করায় সৌদি সমর্থিত বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক বিভাজনও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সৌদি আরবের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো- আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সংঘাতেও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যবহৃত হওয়ায় সৌদি আরবের কাছে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে এসেছে বলে মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এই অবস্থায় সৌদি আরব ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরসহ কয়েকটি দেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব দেশের পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
হুতি ও সৌদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি নতুন করে জড়িয়ে পড়তে চাইছে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চাইলেও ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা বা অন্যান্য পরোক্ষ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান সৌদি আরবের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হুথিদের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালাতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিমান প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক সরঞ্জামের প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হলে সংঘাতের পরিধি আরও বড় হয়ে যেতে পারে। এতে ইয়েমেনের সংঘাত কেবল সৌদি-হুথি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

ইরানের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের ইরানের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করে। ইরান হুথিদের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সহায়তা করে- এমন অভিযোগও বহুবার উঠেছে। তবে হুথিরা নিজেদের ইয়েমেনের স্বাধীন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তাদের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি ইরানের নির্দেশনির্ভর হিসেবে দেখার বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে।
বর্তমান সংঘাতের সময়ে হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নটিকে আবার সামনে এনেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দাবের কাছে হুথিদের অগ্রগতি ইরানের আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব- দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে অস্থির হলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

মানবিক বিপর্যয় বাড়ছে
সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ঘাটতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার মধ্যে থাকা দেশটিতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্য একটি হিসাবে, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশু রয়েছে।
অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ সমুদ্রপথে জিবুতিতেও পালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ইয়েমেনে এমনিতেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপক। নতুন করে বাস্তুচ্যুতি বাড়লে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হাসপাতাল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

তেলের বাজারে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় সামরিক সংঘাতের মতো ইয়েমেনের নতুন উত্তেজনাও জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক। দেশটির তেল স্থাপনা, পাইপলাইন বা রপ্তানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি পরিবহনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সমুদ্রপথে অস্থিরতার কারণে জাহাজ চলাচল নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ রয়েছে।

লোহিত সাগরে নতুন ঝুঁকি
লোহিত সাগর এর আগেও হুথিদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের আলোচনায় এসেছে। গাজা যুদ্ধের পর হুথিদের বিভিন্ন জাহাজে হামলার ফলে বিশ্বের বড় কয়েকটি শিপিং কোম্পানি বিকল্প পথে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় সেই পুরোনো আশঙ্কা আবার ফিরে এসেছে। মোখা ও মায়ুন দ্বীপের মতো কৌশলগত অবস্থান তাদের হাতে থাকা বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে শুধু তেল নয়, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের পরিবহনেও প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘ পথ ঘুরে জাহাজ চলাচল করলে সময় ও বীমা ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এসব ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

সংঘাত কি আরও ছড়িয়ে পড়বে
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, হুথি ও সৌদি আরবের সংঘাত কি ইয়েমেনের সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে? এর ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ইয়েমেনের সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ এখানে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে একই সঙ্গে বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। মিসর ও ওমানসহ কয়েকটি দেশ উত্তেজনা কমাতে যোগাযোগ করছে। চীনও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
হুথিদের পক্ষ থেকেও কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে না জড়ালে সৌদি আরবের জন্য সামরিক অভিযানের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আরও জটিল হতে পারে।

শান্তির পথ কতটা কঠিন
ইয়েমেনে ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। যদিও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় বড় আকারের যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সেই শান্তি টেকসই নয়। এখন আবার যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। জাতিসংঘ সব পক্ষকে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে রাজনৈতিক সমাধানের পথে বড় বাধা হলো ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা। হুথিরা ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব সমর্থিত বাহিনী দেশের অন্য অংশে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ফলে শুধু সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সমঝোতা হলেই ইয়েমেনের সংকট পুরোপুরি শেষ হবে না। ইয়েমেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষকে নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সতর্কবার্তা
হুথি-সৌদি সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, লোহিত সাগরের নৌপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা বড় কোনো হামলা সংঘাতকে দ্রুত বিস্তৃত করে দিতে পারে। বিশেষ করে সৌদি ভূখণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আক্রান্ত হলে রিয়াদের সামরিক প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। আবার ইয়েমেনে বড় ধরনের স্থল অভিযান হলে বেসামরিক হতাহত ও বাস্তুচ্যুতি বাড়তে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো এবং মানবিক সহায়তার পথ উন্মুক্ত রাখা। ইয়েমেনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের বোঝা বহন করছে। নতুন সংঘাত সেই সংকটকে আরও গভীর করলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
হুথি ও সৌদি আরবের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সৌদি আরবের পরবর্তী সামরিক সিদ্ধান্ত, হুথিদের অগ্রযাত্রা, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।

শীর্ষনিউজ