Image description

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) এবারের অধিবেশনে থাকছেন না বিশ্বের দুই বড় দেশের নেতা—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। মোদি টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন না। অন্যদিকে, ১৫ বছরের মধ্যে এই প্রধম কোনো ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না।

 

দুই নেতার অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলাদা করে নজর কেড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মোদি ও মেলোনির সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁদের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলার মধ্যেই জাতিসংঘের মঞ্চে তাঁদের না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।

 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিরল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি এই বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে ভারতের পক্ষে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ বছরও ভারতের হয়ে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপরই রয়েছে।

 

ভাস্কর ইংলিশসহ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তাদের তালিকায় মোদির নাম ছিল। তবে পরে তাঁর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। কেন তিনি অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন, তা জানা যায়নি।

 

মোদির অনুপস্থিতিকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। ক্রমবর্ধমানভাবে ভারত মনে করছে, সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে বক্তব্য ও বক্তৃতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের মতো জরুরি বিষয়গুলোতে অগ্রগতি থমকে থাকায় নয়াদিল্লির হতাশাও বাড়ছে।

এর পরিবর্তে মোদি সরকার উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং কোয়াড ও ব্রিকসের মতো দ্রুতগতির বহুপক্ষীয় ফোরামকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রেখে তাঁকেই ভারতের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৮-২৯ মেয়াদের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আসনের জন্য ভারতের প্রচারাভিযান এবং গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতৃত্বের বিষয়টি।

 

অন্যদিকে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও এ সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন না বলে ফক্স নিউজ ডিজিটালকে নিশ্চিত করেছেন দেশটির এক কর্মকর্তা।

 

মেলোনির এই সিদ্ধান্ত প্রায় ১৫ বছরের একটি ধারাবাহিকতার ছেদ ঘটিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইতালির কোনো না কোনো প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। তবে ২০২০ সালের অধিবেশন মূলত ভার্চুয়ালভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কারণ তখন কোভিড-১৯ মহামারি চলছিল।

 

মোদি তাঁর অনুপস্থিতির কারণ না জানালেও মেলোনি নিজেই তাঁর অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে ব্যস্ত সময়সূচির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গত সাড়ে তিন সপ্তাহে ছয়টি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর দেশে সামলানোর জন্য তাঁর হাতে ‘বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ রয়েছে।

 

মেলোনির অনুপস্থিতির ফলে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আরেকটি মুখোমুখি সাক্ষাতের সম্ভাবনাও থাকছে না। একসময় ট্রাম্প ও মেলোনির সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ছিল। এমনকি ২০২৫ সালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন মেলোনি।

 

তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই নেতার সম্পর্কে প্রকাশ্যে টানাপোড়েন দেখা গেছে। জুনে ট্রাম্প দাবি করেন, জি–৭ সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য মেলোনি ‘অনুনয়–বিনয় করেছিলেন।’ লা–৭ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য খুব করে ধরেছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতাম না, কিন্তু তাঁর জন্য আমার খারাপ লেগেছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘সে সম্ভবত খুশি যে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। আমার তার সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল না।’

 

ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের জবাবে মেলোনি বলেন, ‘আমি শুধু বলতে পারি, এটা হতাশাজনক যে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের ও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে একই দৃঢ়তা দেখান না। বরং তাঁদের নেতাদের সঙ্গে তিনি অনেক বেশি সহনশীল আচরণ করেন।’

 

এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেও মেলোনি ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্যে জড়ান। পোপ লিও চতুর্দশকে নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনাকে তিনি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেও মন্তব্য করেন। জুলাইয়ে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের আগে দুই নেতার মধ্যে ফের প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ দেখা যায়। সে সময় ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথে মেলোনির দিকে তাকিয়ে থাকা একটি ছবির সঙ্গে ‘RESTRAINING ORDER NEEDED’ বা ‘নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ প্রয়োজন’ লিখে পোস্ট করেন।

 

এ নিয়ে জুলাইয়ে স্কাই টিজি ২৪ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, ‘মেলোনির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বক্তব্যই সবকিছু বলে দেয়।’ তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, ‘আমরা মনে করি, আন্তঃআটলান্টিক সম্পর্ক ব্যক্তিবিশেষের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

 

জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে অবশ্য ইতালির অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তাজানি। সম্মেলনের আগে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম এএনএসএকে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘই মৌলিক হাতিয়ার। প্রকৃতপক্ষে আমরা জাতিসংঘের আরও শক্তিশালী ভূমিকা চাই। আমরা বহু উদ্যোগে উপস্থিত রয়েছি এবং এফএওর নেতৃত্বে আমাদের একজন ইতালীয় প্রার্থীও রয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতালির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাপক মনোযোগ রয়েছে।’

 

ফলে মোদি ও মেলোনির অনুপস্থিতি শুধু দুটি দেশের সরকারপ্রধানের সফরসূচির পরিবর্তন নয়, বরং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চকে ঘিরে তাঁদের নিজ নিজ কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেরও প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে। একজনের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিকল্প ফোরামে বেশি মনোযোগ, অন্যজনের ক্ষেত্রে ঘরোয়া ব্যস্ততা ও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন, সব মিলিয়ে এবারের সাধারণ পরিষদে তাঁদের অনুপস্থিতি আলাদা তাৎপর্য পেয়েছে।