রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচন শুরু হয়েছে আজ শুক্রবার। রবিবার পর্যন্ত ভোট দিয়ে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার সদস্য নির্বাচন করবেন রুশরা। ২০২২ সালে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচন।
রাশিয়ায় এবারের নির্বাচন এমন একটি সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটির অর্থনীতির গতি কমছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের ড্রোনগুলো ফ্রন্টলাইন থেকে অনেক দূরের তেল শোধনাগার ও গুদামেও আঘাত হানছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া এবারও পার্লামেন্টে তাদের আধিপত্য ধরে রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
দেশটির কর্তৃপক্ষ নির্বাচনকে ভোটারদের মতামত জানানোর সুযোগ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের দাবি, ব্যালটে প্রকৃত বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে ফলাফল আগেই থেকেই নির্ধারিত।
কীভাবে হয় রাশিয়ার নির্বাচন
আজ শুক্রবার শুরু হয়ে রবিবার পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। এতে রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার সদস্য নির্বাচন করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
দেশটির ১১টি অঞ্চলে গভর্নর এবং ৩৯টি অঞ্চলে আঞ্চলিক আইনসভাগুলোর সদস্য নির্বাচন করা হবে।
১১ কোটি ১০ লাখ ভোটারের অংশগ্রহণ বাড়াতে তিন দিন ধরে ভোট নেওয়া হচ্ছে। ইউক্রেনের যেসব এলাকা রাশিয়ার দখলে রয়েছে, সেগুলোও রয়েছে ভোটের আওতায়। ইলেকট্রনিক ভোট দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
স্টেট ডুমার ৪৫০টি আসনের অর্ধেক দলীয় তালিকার মাধ্যমে এবং বাকি অর্ধেক একক আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
ইউনাইটেড রাশিয়া কী
ক্রেমলিনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো একীভূত হওয়ার মাধ্যমে ২০০১ সালে ইউনাইটেড রাশিয়া গঠিত হয়। এর পর থেকেই দলটি ক্ষমতায় রয়েছে। শুরু থেকেই পুতিনকে সমর্থন করে আসছে এবং পার্লামেন্টে আধিপত্য ধরে রেখেছে দলটি।
২০২১ সালের নির্বাচনে স্টেট ডুমার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছিল ইউনাইটেড রাশিয়া। এবারও দলটি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
দলটির প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন রাশিয়ার প্রভাবশালী রাজনীতিকরা। তাদের মধ্যে আছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ, যিনি ২২ বছর ধরে রাশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আছেন মস্কোর প্রভাবশালী মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনও।
দলটিকে ব্যাপকভাবে আমলাতন্ত্রনির্ভর হিসেবে দেখা হলেও নতুন মুখ যুক্ত করার প্রচেষ্টায় ইউনাইটেড রাশিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তি হিসেবে যুদ্ধ সংবাদদাতা ইয়েভগেনি পডডুবনিকে সামনে আনা হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
রাশিয়ার নির্বাচনে আর কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে
ইউনাইটেড রাশিয়ার পাশাপাশি সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সমর্থন করা অন্যান্য ‘ব্যবস্থাপনাধীন বিরোধী’ দলও পার্লামেন্টে তাদের অবস্থান ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদারপন্থী ইয়াবলোকো পার্টি ছিল একমাত্র নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, যারা ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করে। শুরুতে দলটি নির্বাচনের ব্যালটে ছিল। তবে আগস্টে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে দলটিকে বাদ দেওয়া হয়।
আদালতের রায়ে বলা হয়, দলটির যুদ্ধবিরোধী অবস্থান রাশিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের আহ্বানের সমতুল্য। দলটি কেবল একক আসনের নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।
১৯৯০-এর দশক থেকে ফেডারেল অ্যাসেম্বলিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে থাকা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন ৮২ বছর বয়সী গেন্নাদি জিউগানভ। সাবেক এই সোভিয়েত কর্মকর্তা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
পুতিনের ২৫ বছরের বেশি সময়ের শাসনামলে কমিউনিস্টরা সরকারের নীতির কিছু দিকের সমালোচনা করলেও পুতিনের সরাসরি সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে। ইউক্রেনে যুদ্ধের প্রতিও দলটির দৃঢ় সমর্থন রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আলেক্সান্ডার ব্রাটারস্কির মতে, নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান কে পায়, সেটিও দেখার বিষয়।
তার ভাষ্য, কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় হলে সেটি ‘অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ায় ভোটারদের ক্ষোভের’ বহিঃপ্রকাশকেই নির্দেশ করতে পারে।
১৯৯০-এর দশক থেকে আইনসভায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী’ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও ডুমায় কিছুটা প্রভাব ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই দলটিও ইউক্রেন যুদ্ধকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। দলটির একাধিক সদস্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাবেক সেনাসদস্য। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ছোট দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
‘আ জাস্ট রাশিয়া’ নামে একটি দলও রয়েছে নির্বাচনে। গত ২০ বছর ধরে রাশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক এই দলটি। বয়স্ক ও মধ্যবয়সী ভোটারদের সমর্থনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটি। ইউক্রেনে যুদ্ধকেও সমর্থন রয়েছে তাদেরও।
২০২১ সালের সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে প্রতিষ্ঠিত হয় নিউ পিপল পার্টি। তরুণ ভোটার ও কারিগরি দক্ষ পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্বকারী উদারপন্থী কণ্ঠ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য ছিল দলটির। ২০২১ সালে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে জায়গা করে নিয়েছিল দলটি।
এ ছাড়া নির্বাচনে আসন পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে প্রধান কমিউনিস্ট পার্টির একটি ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী কমিউনিস্টস অব রাশিয়া, পার্টি অব পেনশনার্স, গ্রিন পার্টি, পার্টি অব ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি এবং মাদারল্যান্ড পার্টি।
ক্রেমলিনের কাছে এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়ার এবারের নির্বাচনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই প্রথম সংসদ নির্বাচন।
ব্রাটারস্কির ভাষ্য, পুতিন নিজেই নির্বাচনকে যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আগস্টে ইউনাইটেড রাশিয়ার দলীয় কংগ্রেসে সমর্থন জানিয়ে পুতিন বলেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধে ‘বিজয়ের জন্য সবকিছু করা’ দলটির দায়িত্ব।
ব্রাটারস্কির ভাষ্য, ‘এটি স্পষ্ট, ক্রেমলিন কিছুটা উদ্বিগ্ন। কারণ ক্রেমলিনের প্রতি অসম্মান দেখানোর একমাত্র বৈধ উপায় হলো নির্বাচন।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘এমনকি পুতিনের কট্টর সমর্থকেরাও ইউনাইটেড রাশিয়াকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত শক্তি হিসেবে ঘৃণা করেন।’
আগের নির্বাচনগুলো কেমন ছিল
২০০০ সালে পুতিন প্রথম ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিটি ডুমা নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়া বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে। তবে এসব নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
২০১১ সালে ভোট কারচুপির অভিযোগ পুতিনের শাসনামলের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের সূচনা করেছিল।
২০২১ সালের নির্বাচনের পর স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও পরিসংখ্যানবিদেরা বলেছিলেন, সরকারি হিসাবে দেখানো ফলাফলের তুলনায় দলটির প্রকৃত সমর্থন অনেক কম ছিল।
তবে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কর্তৃপক্ষ। বিরোধী দল ও যুদ্ধের সমালোচকদের ক্রমেই নির্বাচনের ব্যালট থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
সূত্র : আলজাজিরা