বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আর কোনো একক শক্তিকেন্দ্রের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং ব্রিকস সম্মেলনের দিকে তাকালে এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সরকারগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজেদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক শাসনের যে বহু পুরোনো কাঠামোগুলো রয়েছে, তা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। এটি কেবল পুরোনো ব্যবস্থার অকার্যকারিতার জন্য ঘটেনি, বরং বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার পুনঃবণ্টন ও পরিবর্তনের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্তৃক ঘোষিত গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ বা জিজিআই তার দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করেছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি ডট কমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিয়েনজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও প্লাস সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন প্রথম এই উদ্যোগের সূচনা করেন, তখন অনেকে এটিকে স্রেফ একটি কূটনৈতিক অসার বার্তা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে এক বছর পার হতেই দেখা যাচ্ছে, চীন এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিবাদ মধ্যস্থতা, ডেটা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত বেশ কিছু নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে চীন তার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামোর ভেতরেও এই ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করছে। বিশ্বের সার্বিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে চীন বৈশ্বিক কাঠামোর একটি ভিন্ন রূপরেখা তৈরি করছে।
জিজিআই-এর মূল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, বর্তমান বৈশ্বিক শাসনের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের পরিবর্তিত ক্ষমতার সমীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সমর্থ হয়নি। তবে চীন এর সমাধান হিসেবে বহুপাক্ষিকতাবাদকে ত্যাগ করার পক্ষে নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু পরাশক্তির হাতে ক্ষমতার যে কেন্দ্রীভবন ঘটে রয়েছে, তা শিথিল বা লঘু করতে চায়। এই ধারণার মূলে রয়েছে প্রতিটি দেশের সার্বভৌম সমতা—অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্র তার আয়তন, সম্পদ বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার পাবে। এটি চীনের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চীনের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ সাধারণ নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেয়; গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে; আর গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সংলাপে গুরুত্ব দেয়। জিজিআই মূলত এই সমস্ত চিন্তাধারাকে আন্তর্জাতিক শাসন কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি মূল ছাতা হিসেবে কাজ করছে।
চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কোনো ধরনের বিভাজন বা বিচ্ছিন্নতা চায় না। দেশটি ১৬০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং ৩১টি দেশের সঙ্গে ২৪টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। তবে বেইজিং মনে করে, অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের অর্থ এই নয় যে রাজনীতিকেও পশ্চিমা মডেলে পরিচালিত হতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর যুগের বিশ্বায়ন মূলত নব্য-উদারবাদী ওয়াশিংটন কনসেনসাস এবং পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। চীন এর বিকল্প হিসেবে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও নিজের উন্নয়ন কৌশল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্মুক্ততার একটি মডেল উপস্থাপন করেছে। এ কারণেই বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা, একতরফা অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে চীনের জোরালো অবস্থান প্রকাশ পায়, যা তাদের সমর্থিত বিশ্বায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চীন চায় অর্থনৈতিক পরস্পরনির্ভরশীলতা বজায় থাকুক, কিন্তু তা যেন কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
চীন মনে করে, বিশ্ব বর্তমানে একটি বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি বাণিজ্য বিভাজন, জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণের বোঝা এবং প্রযুক্তির বৈষম্য বিদ্যমান। বেইজিং বিশ্ব ব্যবস্থার এই ঘাটতিগুলোকে পাঁচটি ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে: শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শাসন ও বিশ্বাসের ঘাটতি। বেইজিংয়ের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন আমেরিকা ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখনকার তৈরি কাঠামোর মাধ্যমে আজকের জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও তাদের অনুপাত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে স্থান দেওয়া হচ্ছে না। চীনা বিশেষজ্ঞ ওয়াং ইওয়ে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, বৈশ্বিক শাসন মানে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলোর শাসন নয়, বরং গ্লোবাল সাউথসহ বিশ্বের সব দেশের যৌথ শাসন, যেখানে গ্লোবাল সাউথ মূলত বিশ্ব জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
জিজিআই উদ্যোগের প্রথম বছরেই বেইজিং এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হংকংয়ে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মেডিয়েশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে। স্বেচ্ছাসেবী ও অ-বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এটিই প্রথম আন্তঃসরকারি সংস্থা, যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ৩৩টি দেশ যোগ দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা দূর করতে সাহায্য করছে। এর দুই মাস পর, জাতিসংঘে ৪৩টি সদস্য দেশকে নিয়ে চীন গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব গ্লোবাল গভর্নেন্স গঠন করে, যা জাতিসংঘের মূল কাঠামোর ভেতরে থেকেই বিশ্ব ব্যবস্থার সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়।
পরবর্তীকালে, ২০২৬ সালের মার্চে বেইজিংয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড ডেটা অর্গানাইজেশন। এরপর ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এআই সম্মেলনে ২৯টি দেশের সম্মতিক্রমে ওয়ার্ল্ড এআই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়, যার সদর দপ্তর সাংহাইয়ে নির্ধারিত হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা প্রবাহের এই যুগে এগুলো বৈশ্বিক শাসনের নতুন ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই উদীয়মান প্রযুক্তি ও ডেটার ক্ষেত্রে যারা নিয়মকানুন নির্ধারণে নেতৃত্ব দেবে, ভবিষ্যতে তাদের প্রভাব কেবল কনফারেন্স রুমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
জাতিসংঘকে কেন্দ্র রেখে বহু মেরুবিশিষ্ট বিশ্বের কথা বলা আপাতদৃষ্টিতে একটি বৈপরীত্য মনে হতে পারে, তবে বেইজিংয়ের চিন্তায় এটি কোনো দ্বিমুখিতা নয়। চীন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে চায় না, বরং এর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে চায়। ২০০০ সালে জাতিসংঘের মূল বাজেটে চীনের অবদান ছিল ১ শতাংশেরও কম, যা ২০২৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ শতাংশের বেশি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পর চীনই এখন জাতিসংঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থায়নকারী দেশ। চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও (২০২৬-২০৩০) স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দেশটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা রক্ষা করতে, সংরক্ষণবাদের বিরোধিতা করতে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসন সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
চীনের এই কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহাসিক মূলও বেশ গভীর। ১৯৫০-এর দশকে প্রবর্তিত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি এবং ১৯৭০-এর দশকে মাও সেতুংয়ের তিনটি বিশ্বের তত্ত্ব আজও চীনের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে। এছাড়া প্রাচীন চীনা মেধাভিত্তিক ধারণা তিয়ানক্সিয়া বা স্বর্গের নিচের সবকিছু—যা মূলত সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো বিশ্বকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা করে—চীনের আন্তর্জাতিক চিন্তাভুবনের পটভূমি তৈরি করেছে। আজকের আধুনিক সংস্করণে এটি চীনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কোনো চেষ্টা নয়, বরং এটি বিশ্বকে একটি সংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখার প্রয়াস যেখানে সব সভ্যতা একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।
জিজিআই-এর প্রথম বছর প্রমাণ করেছে যে চীন বিশ্ব কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করতে সক্ষম। তবে এখন আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই নতুন সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক জনগণের জন্য বাস্তবিক সুফল বা বৈশ্বিক জনপণ্য তৈরি করতে পারছে কি না তা নিশ্চিত করা। নতুন গঠিত এআই বা ডেটা সংস্থাগুলো এমন নিয়ম তৈরি করতে পারবে কি না যা পশ্চিমা শিবিরের দেশগুলোও মেনে নেবে, কিংবা এসসিও এবং ব্রিকস তাদের বর্ধিত সদস্যসংখ্যাকে কার্যকর যৌথ পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে কি না—সেটাই এখন দেখার বিষয়। চীন মূলত বাজি ধরেছে যে, বিশ্ব অনিবার্যভাবে বহুমুখী মেরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয় এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, নয়তো তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হবে।