মহাকাশকে নতুন সামরিক রণক্ষেত্রে পরিণ করার চরম আশঙ্কার মধ্য কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন এই পদক্ষেপকে মহাকাশ যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে চীন ও রাশিয়া। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে তারা মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বাহিনী (স্পেস ফোর্স) এক বিবৃতিতে জানায়, প্রতিকূল প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে রক্ষা করতে কক্ষপথভিত্তিক ‘মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র’ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে ঠিক কী ধরনের এবং কতটি অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, তা প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।
মার্কিন মহাকাশ বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কক্ষপথে এমন মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র রয়েছে, যা যৌথ বাহিনীকে প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করতে সক্ষম।’
বিবৃতিতে এই সক্ষমতাকে গতিশীল (কাইনেটিক) ও অগতিশীল (নন-কাইনেটিক) দুই ভাগে উল্লেখ করে বলা হয়, এগুলো আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে।
চীন ও রাশিয়ার সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পরপরই আজ মঙ্গলবার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি মহাকাশকে যে কোনো ধরনের অস্ত্র থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা উচিত’। তিনি আরও জানান, মহাকাশের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে মস্কো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
একই দিনে ওয়াশিংটনের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘আমরা মার্কিন পক্ষকে তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মহাকাশে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিনের সন্দেহকেই সত্যি প্রমাণিত করল। তবে এই তথ্য প্রকাশ্যে আসায় ওয়াশিংটন, বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে বিদ্যমান বৈশ্বিক উত্তেজনা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
মহাকাশে কী ধরনের মার্কিন অস্ত্র থাকতে পারে?
মার্কিন মহাকাশ বাহিনী সুনির্দিষ্ট কোনো অস্ত্র ব্যবস্থার নাম প্রকাশ না করলেও তাদের উল্লেখিত কাইনেটিক ও নন-কাইনেটিক প্রযুক্তি থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। নন-কাইনেটিক সক্ষমতার মধ্যে স্যাটেলাইটকে অকার্যকর বা অন্ধ করার লেজার প্রযুক্তি এবং স্যাটেলাইটের যোগাযোগ ও ডেটা লিঙ্কে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী তড়িৎচুম্বকীয় বা সাইবার সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মতে, মহাকাশে রাশিয়া ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রধান সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ। চীনের দ্রুত সামরিক আধুনিকীকরণ এবং রাশিয়ার মহাকাশকেন্দ্রিক যুদ্ধকৌশল মার্কিন সামরিক মহাকাশ ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
মহাকাশ দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগ, নজরদারি, দিকনির্দেশনা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে স্যাটেলাইটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে বড় কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে এগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
মহাকাশের সামরিকীকরণ অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক উৎক্ষেপণের পর শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশের সামরিক ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করে।
২০১৯ সালে ‘মিশন শক্তি’ পরিচালনার মাধ্যমে নিম্ন ভূ-কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করে ভারত। এর মধ্য দিয়ে দেশটি স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী সক্ষমতা প্রদর্শনকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়।
এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ঘোষণার ফলে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে কি না। বিশেষ করে এমন সময়ে এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যখন ওয়াশিংটন, বেইজিং ও মস্কো পৃথিবীর বাইরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র এবং অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ করে। তবে, এটি মহাকাশে সামরিক কার্যকলাপকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে না।
মহাকাশ আইন বিশেষজ্ঞ লেটিশিয়া সেসারি বলেছেন, এর ফলে একটি নিয়ন্ত্রক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, কারণ চুক্তিটির ৪ নং অনুচ্ছেদে প্রচলিত অ্যান্টি-স্যাটেলাইট বা অন্যান্য মহাকাশ অস্ত্রের পরিবর্তে বিশেষভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা বলা হয়েছে।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ বৈঠকে বিষযেটি নিয়ে বড় ধরনের আলোচনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে রাশিয়া ও চীন মহাকাশে অস্ত্র স্থাপনে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে এবং পশ্চিমা দেশগুলো "দায়িত্বশীল আচরণবিধির" পক্ষে প্রস্তাব তুলতে পারে।