Image description

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শেষ ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ১০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীও রয়েছেন। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি ও তার গর্ভের সন্তান মারা যায়।

নিহত ওই নারীর নাম ইমান শালুফ। তার বয়স ২৭ বছর। শনিবার দক্ষিণ খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় পরিবারের তাঁবুতে বসে থাকার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে তার মাথায় আঘাত লাগে। পরে তাকে নাসের হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকেরা শুরুতে তার গর্ভের শিশুর হৃদস্পন্দন শনাক্ত করেছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পর ইমান ও তার গর্ভের সন্তান দুজনই মারা যায়।

স্বজনেরা জানিয়েছেন, ইমান তার সন্তানের নাম আয়ুব রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আগামী নভেম্বরে তার সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা ছিল।

ইমানের শাশুড়ি ওয়াথফা আবু মাশি জানিয়েছেন, গুলির শব্দ শোনার পর তিনি ইমানের খোঁজ নেন। পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁবুর ভেতর পাওয়া যায়।

ইমানের স্বামী ইসমাইল আবু মাশি বলেছেন, ‘তারা যে যুদ্ধবিরতির কথা বলছে, সেটি কোথায়? এর কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রতিদিন এখানে মানুষ মারা যাচ্ছে।’

ইমান ও তার সন্তানের জানাজা নাসের হাসপাতালে অনুষ্ঠিত হয়। পরে খান ইউনিসে তাদের পাশাপাশি দাফন করা হয়।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।

এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় ১০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫৬ জন আহত হয়েছেন। গাজার উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে বেইত লাহিয়ায় একটি বাড়িতে হামলায় একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন মোমেন আহমেদ, তার স্ত্রী হানিন সালেহ এবং তাদের দুই মেয়ে ১২ বছরের লানা ও ৮ বছরের বান্না।

এ ছাড়া শুক্রবার খান ইউনিস ও গাজা সিটিতে আরও ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন আগের হামলায় আহত হয়ে পরে মারা যান।

বেইত লাহিয়ায় শুক্রবারের হামলায় আরও দুইজন গুরুতর আহত হন। একই শহরে গুলিতে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীসহ তিনজন আহত হয়েছেন।

শনিবার আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি তাঁবুতে গোলাবর্ষণে নয়জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট।

রোববার গাজা সিটির তেল আল-হাওয়ায় একটি গাড়িতে হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নারী ও শিশু বহনকারী একটি বাসের যাত্রীরাও এতে আহত হন।

জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২৩ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজায় অন্তত সাত শিশু নিহত হয়েছে। আরও কয়েকজন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর ও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়ের জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় গাজায় নিয়মিত মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছেন। ৬ থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী ১৮টি কথিত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। এ সময় তাদের একটি ক্লিনিক থেকে ২৫০ ফুটেরও কম দূরত্বে একটি ভবনে হামলা হয়েছে।

গাজায় মানবিক পরিস্থিতিও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষ ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সামনে বর্ষা মৌসুম। এতে বন্যা ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অর্থের সংকট ও চলাচলে বাধার কারণে তাদের প্রস্তুতিতেও সমস্যা হচ্ছে।

৩১ আগস্ট ইসরায়েলে লবণমুক্ত পানি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় গাজায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের পানির সরবরাহ কমে যায়। এসব মানুষ ইসরায়েলের বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল।

জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের সংকটে গাজার বিভিন্ন হাসপাতালের কয়েকটি বিদ্যুৎ জেনারেটরও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৬২৭ জন আহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৭৮৩ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান