Image description

নাইন-ইলেভেন হামলার ২৫ বছর পূর্তির ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে উঠে এলো পুরনো দিনের এক নতুন গল্প। দাবি করলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর গ্রাউন্ড জিরোর কাছে অবস্থানকালে একটি ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় দুই ফায়ারম্যান তাকে তুলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ২৫ বছর পর প্রকাশ্যে আসা এই বর্ণনাই এখন জন্ম দিয়েছে নতুন প্রশ্ন— সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?

গত ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনের এলিপসে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ৯/১১-পরবর্তী নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন ট্রাম্প। তার ভাষ্য, হামলার পর তিনি তার নির্মাণকর্মীদের নিয়ে ধ্বংসস্তূপ এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে একটি ভবন কাঁপছিল এবং সেটি তাদের ওপর ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়।

ট্রাম্পের দাবি, পরিস্থিতি বুঝে দুই ‘শক্তিশালী’ ফায়ারম্যান তাকে দ্রুত সরে যেতে বললেন। এরপর তারা তার দুই হাতের নিচে ধরে তাকে তুলে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন।

নিজের ওজনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন ট্রাম্প। তার বক্তব্যের ধরন ছিল এমন— তাকে এভাবে তুলে নিয়ে দৌড়ানো সহজ কোনো কাজ ছিল না। কিন্তু গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতেই এখন প্রশ্ন।

এ ঘটনার স্বাধীন প্রমাণ কোথায়?

এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই নির্দিষ্ট দাবির সমর্থনে কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, সরকারি নথি, নির্ভরযোগ্য ভিডিও বা শনাক্তযোগ্য দুই ফায়ারম্যানের বক্তব্য সামনে আসেনি। ফলে ঘটনাটি এখনো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্মৃতিনির্ভর দাবি হিসেবেই রয়েছে।

৯/১১-এর পর ট্রাম্পের গ্রাউন্ড জিরো যাত্রা

হামলার সময় ট্রাম্প ছিলেন ম্যানহাটনের ট্রাম্প টাওয়ারে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে সেটি কয়েক মাইল দূরে। হামলার পর তিনি লোয়ার ম্যানহাটনে গিয়েছিলেন— এমন ছবি, ভিডিও এবং সে সময়কার তার বক্তব্যের রেকর্ড রয়েছে।

পরবর্তী বছরগুলোতে ট্রাম্প বহুবার বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণকর্মীরা গ্রাউন্ড জিরোর উদ্ধার ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে সহায়তা করেছিলেন। তবে এবারের বক্তব্যে যুক্ত হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন উপাদান— দুই ফায়ারম্যান তাকে তুলে নিয়ে দৌড়েছিলেন। এই নির্দিষ্ট ঘটনার কোনো স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শী এখনো প্রকাশ্যে সামনে আসেননি।

দেড় ঘণ্টায় বদলে যাওয়া আমেরিকার সেই দিন

সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিভীষিকা। ১৭ মিনিট পর, ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। মুহূর্তেই ধোঁয়া, আগুন আর ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায় ম্যানহাটনের আকাশ।

৯টা ৩৭ মিনিটে একটি বিমান পেন্টাগনে আঘাত হানে। ৯টা ৫৯ মিনিটে দক্ষিণ টাওয়ার ধসে পড়ে। এর ২৯ মিনিট পর, ১০টা ২৮ মিনিটে উত্তর টাওয়ারও ধসে যায়। এর মধ্যে ১০টা ৩ মিনিটে যাত্রীদের প্রতিরোধের পর ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে বিধ্বস্ত হয়।

মাত্র এক ঘণ্টা ৪২ মিনিটে বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস। প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নিউ ইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ৩৪৩ সদস্য। হাজারো উদ্ধারকর্মী এরপর জীবন বাজি রেখে গ্রাউন্ড জিরোতে উদ্ধারকাজ চালান।

২৫ বছর পর কেন নতুন গল্প?

এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১১ সেপ্টেম্বরের ২৫ বছর পূর্তি সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চলছে স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রস্তুতি। সে সময়েই ৯/১১-পরবর্তী নিজের অভিজ্ঞতার আরও ব্যক্তিগত ও নাটকীয় বর্ণনা সামনে আনলেন প্রেসিডেন্ট।

সমর্থকদের যুক্তি, ২৫ বছর আগের কোনো ঘটনার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে খুঁটিনাটি বদলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই স্বাধীন প্রমাণ না থাকলেই বক্তব্যকে মিথ্যা বলা যায় না।

সমালোচকদের প্রশ্ন আরও কঠিন— এমন নাটকীয় ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের মতো কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, ছবি, ভিডিও কিংবা নথি নেই কেন?

কারণ ৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার ইতিহাস নয়; এটি প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু, ৩৪৩ ফায়ারফাইটারের আত্মত্যাগ এবং আমেরিকার ইতিহাসের এক গভীর ক্ষতের নাম।

তাই ২৫ বছর পর ট্রাম্পের মুখে উঠে আসা ‘দুই ফায়ারম্যানের’ গল্প এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়। এটি ইতিহাসের সামনে রাখা একটি নতুন দাবি। আর সেই দাবির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো একই— স্মৃতি কতটা সত্য, আর প্রমাণ কোথায়?