Image description

পাথর আর বালুর ছোট্ট এক দ্বীপ। চারপাশে উত্তপ্ত সমুদ্র, দূরে দেখা যায় আফ্রিকার উপকূল। ইয়েমেনের পেরিম বা স্থানীয় ভাষায় মাইয়ুন দ্বীপ আজ আর নিঃসঙ্গ ভূখণ্ড নয়; ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন কৌশলগত পুরস্কার।

বৃহস্পতিবার সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেরিম বসে আছে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে। এখান থেকে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া চোখে পড়ে; আফ্রিকার উপকূল মাত্র ১২ মাইল দূরে। একসময় ভারতগামী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জাহাজের কয়লা ভরার স্টেশন ছিল দ্বীপটি। সেই সাম্রাজ্যিক ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই এখন অবস্থান করছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত সেনারা।

হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সৌদি আরব তার রপ্তানির বড় অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে পাঠাচ্ছে। ফলে বাব আল-মান্দাব এখন হরমুজের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কিন্তু ইরানঘনিষ্ঠ হুতিরা উপকূল ধরে দক্ষিণে এগিয়ে পেরিম দখল করতে পারলে এই সরু জলপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা অনেক সহজ হবে।

সিএনএনকে ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক সালেহ বলেছেন, ইয়েমেনিরা বহু আগে থেকেই বিশ্বকে ইরানের প্রকল্প সম্পর্কে সতর্ক করেছিল; “এটি এখন ভূরাজনীতি”। সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা তারিক নিজ দেশেই থেকে সামরিক বাহিনী পরিচালনা করছেন। তাঁর দাবি, ইরান তাঁকে হত্যা করতে চায় এবং ওয়াশিংটনের কাছ থেকে তিনি পাচ্ছেন “শুধু কথাই”। পেরিম হারালে হুতিদের সরাতে “বিশাল আন্তর্জাতিক বাহিনী ও নৌবহর লাগবে” বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সিএনএনের দলটির দ্বীপে পৌঁছানোও ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। মূল ভূখণ্ড থেকে দুই মাইল নৌপথ পাড়ি দেওয়ার সময় হুতি ড্রোন হামলার সতর্কতায় পুরোনো গানবোটটি একবার ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

২০১৪ সালে সানা দখল করে হুতিরা ইয়েমেনের সরকারকে দক্ষিণে সরিয়ে দেয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যুদ্ধে নামে। ইরান হুতিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে সিএনএন জানিয়েছে; হুতিরা বলছে, তাদের বর্তমান অভিযান সৌদি ‘আগ্রাসন ও অবরোধের’ জবাব।

এরই মধ্যে মোখা বন্দরে কয়েক সপ্তাহ আগে ২৫টির বেশি হুতি রকেট আঘাত হানে বলে বন্দর পরিচালক আবদেল মালেক আল-শারাবি জানিয়েছেন। এতে ১৬ জন নিহত, ২২ জন আহত, ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে এবং ১৪ হাজার মোটরসাইকেল ধ্বংস হয়। জেলেদেরও ড্রোন হামলায় প্রাণহানি ও ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে।

সরকারি বাহিনী এখন এফপিভি কোয়াডকপ্টার ড্রোন ব্যবহার করছে। অন্যদিকে কর্মকর্তারা সিএনএনকে একটি জব্দ করা চালান দেখিয়েছেন, যাতে ১৮ ফুট দীর্ঘ ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার রাডার, ড্রোন ইঞ্জিন, অপটিক্যাল যন্ত্র এবং ট্রাকের ব্যাটারিতে লুকানো গুলি ছিল। সামরিক কর্মকর্তা আবদেল নাসের আল-মামলুহর দাবি, চোরাকারবারিরা একই আকারের আরও ১১টি চালান নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে, যা মোট প্রায় ৭৫০ টন।

হুতিদের কাছে দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র এবং কথিত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। গত বছরে তারা এক হাজার মাইলের বেশি দূরের ইসরায়েলেও হামলা চালিয়েছে।

তিন বছর আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১০ শতাংশ বাব আল-মান্দাব দিয়ে যেত; কেপলারের হিসাবে তা এখন অর্ধেকে নেমেছে। আল-মামলুহর সতর্কতা, পেরিম হাতছাড়া হলে হুতিদের আর দূরপাল্লার অস্ত্রও লাগবে না, “তারা প্রণালীতে মাইন বসাবে, যেমন ইরান হরমুজে করেছে।”

সিএনএনের প্রতিবেদনের কয়েক ঘণ্টা পর রয়টার্স জানায়, হুতিরা মোখা দখল করেছে। একই দিনে ব্রেন্ট তেল ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছাড়ায়। অর্থাৎ মানচিত্রে ক্ষুদ্র পেরিমের নিয়ন্ত্রণ এখন ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের চেয়েও বড় প্রশ্ন, এটি এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্য, সৌদি তেল রপ্তানি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

রয়টার্সের সর্বশেষ তথ্য আরও উদ্বেগজনক। হুতিরা হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালিয়ে সরকারি বাহিনীকে ধুবাবের দিকে ঠেলে দিয়েছে; ধুবাব পেরিমের ঠিক বিপরীতে। ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি দীর্ঘ লড়াই অনেকটা থামালেও স্থায়ী শান্তি আনেনি। নতুন এই সংঘর্ষ ইয়েমেনকে আবার পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।