পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি আধুনিক চালকবিহীন সাবমেরিন জব্দের দাবি করেছে ইরান। এর আগে পাঁচটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সরকারি সংবাদমাধ্যম সেপাহ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জটিল গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে ‘ডাইভ-এলডি’ নামে পরিচিত ওই আনম্যানড আন্ডারওয়াটার ভেহিকেলটি আটক করা হয়।
আইআরজিসির নৌবাহিনী দাবি করেছে, যানটিতে বিশ্বের আধুনিকতম সাবসারফেস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে তারা।
পৃথক এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।
কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র?
অত্যাধুনিক চালকবিহীন সাবমেরিন জব্দে ইরানের দাবির পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আঞ্চলিক জলসীমা জরিপের সময় একদিনেরও বেশি আগে তাদের একটি পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোনে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। তবে সেটিই ইরানের হাতে পড়েছে কি না, তা স্পষ্ট করেনি পেন্টাগন।
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেন, ড্রোনটি চলমান সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণ করছিল। এটি পুরনো মডেলের ছিল এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা বা শ্রেণিবদ্ধ সোনার ও রাডার সরঞ্জাম ছিল না।
মার্কিন নৌবাহিনী বর্তমানে পানির নিচে ও পানির উপর চলাচলকারী চালকবিহীন বিভিন্ন ব্যবস্থা উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। বিশাল সমুদ্রাঞ্চল পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং শত্রুপক্ষের জাহাজ ও সাবমেরিন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা ব্যবহারের পাশাপাশি এতে নাবিকদের ঝুঁকিও কমে।
ডাইভ-এলডি মূলত কী?
প্রতিরক্ষাবিষয়ক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ডিফেন্সস্কুপের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ডাইভ-এলডির প্রতিটি ইউনিটের দাম প্রায় ২৫ লাখ ডলার।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিলের তথ্য অনুযায়ী, এটি ঘাঁটিতে ফিরে না গিয়ে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত কাজ করতে পারে এবং প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরতায় ডুব দিতে সক্ষম।
মার্কিন চাপ বৃদ্ধি
এদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
ইরানের ওপর চাপ আরো বাড়াতে দেশটির বাকি সব এয়ারলাইনসকে লক্ষ্য করে ২৭টি ইরানি বিমান সংস্থাকে বিশেষভাবে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় (এসডিএন) যুক্ত করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলো দেশটির ‘অস্থিতিশীলতামূলক কর্মকাণ্ডে’ সহায়তা করে এবং আইআরজিসি অস্ত্র সংগ্রহ ও পরিবহন এবং সদস্যদের যাতায়াতে এসব বিমান সংস্থা ব্যবহার করে।
পাল্টা অবস্থানে ইরান
দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘আগ্রাসীদের’ সম্পূর্ণ অনুশোচনায় না আনা পর্যন্ত শক্ত অবস্থানে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে ইরান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরান সব সময় যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় ইরান যেভাবে সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ করেছে, ভবিষ্যতেও শক্ত অবস্থানে সেই প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে যৌথ হামলা চালায়। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করে।
এরপর গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করে। চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনায় বসার কথা ছিল দুই দেশের। সেই সময়সীমা ১৭ আগস্ট শেষ হলেও সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আলোচনার ভবিষ্যৎ এখনো স্পষ্ট নয়।