Image description

গ্রিস ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৩১ আগস্ট দুই দেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আওতায় গ্রিসের জন্য ইসরাইল একটি সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পে ডেভিডস স্লিং, বারাক এমএক্স, স্পাইডার এবং বহুমুখী রাডারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তিটিকে দুই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

লেখক মুরাত আসলান এই চুক্তিকে শুধু অস্ত্র কেনাবেচা হিসেবে দেখেননি। তার মতে, এর মধ্য দিয়ে গ্রিসের নিরাপত্তা কাঠামো ক্রমেই ইসরাইলি প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামটিকেও তিনি প্রতীকীভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গ্রিক পুরাণের বীর অ্যাকিলিসের বিপরীতে তিনি হিব্রু ‘আয়িল’ শব্দের উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ আব্রাহামের কাহিনিতে বিকল্প হিসেবে উৎসর্গ করা ভেড়া। তার যুক্তি, গ্রিসের কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত ‘অ্যাকিলিস’ শেষ পর্যন্ত অন্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত ‘আয়িল’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

চুক্তিটির সামরিক গুরুত্ব অবশ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গ্রিসকে ডেভিডস স্লিং, বারাক এমএক্স, স্পাইডার এবং এমএমআর রাডারসহ একটি বহুস্তরীয় আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করবে ইসরাইল। গ্রিসের বৃহত্তর ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী বছরগুলোতে দেশটি আরো বিপুল অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছ থেকে অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনাও এর সঙ্গে যুক্ত।

এথেন্সের দৃষ্টিতে এর প্রধান কারণ তুরস্ক। এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা, দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ, মহীসোপান, জ্বালানি সম্পদ এবং সাইপ্রাসকে ঘিরে গ্রিস ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস সম্প্রতি এজিয়ান সাগরে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমা সম্প্রসারণের অধিকার নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, গ্রিস কীভাবে নিজেদের সশস্ত্র করবে সে বিষয়ে কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে তুরস্কের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। আঙ্কারা পূর্ব এজিয়ান দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণের বিরোধিতা করে এবং গ্রিসকে ১৯২৩ সালের লওজান চুক্তি ও ১৯৪৭ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, তুরস্ক অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল করতে চায় না, কিন্তু নিজেদের অধিকার লঙ্ঘনও মেনে নেবে না।

এই অবস্থায় গ্রিস-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ইসরাইলের দৃষ্টিতে তুরস্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমে যাওয়া, রাশিয়ার আঞ্চলিক ভূমিকার পরিবর্তন এবং তুরস্কের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ফলে ইসরাইল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে—এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

গ্রিস, ইসরাইল ও গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের মধ্যে সামরিক, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও গত এক দশকে বেড়েছে। ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রতিরোধ, বিমান প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রযুক্তির সহযোগিতা। অন্যদিকে তুরস্কও সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’সহ নতুন নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

তবে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নয়। গ্রিস যদি তার আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার ও সামরিক কমান্ড কাঠামোর বড় অংশ বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, তাহলে সংকটের সময়ে সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে গ্রিস যদি এমন একটি আঞ্চলিক সংঘাতের কাঠামোর অংশ হয়ে যায়, যার সিদ্ধান্ত এথেন্সের হাতে পুরোপুরি নেই, তাহলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়লেও কৌশলগত স্বাধীনতা কমতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে গ্রিসের অবস্থানও একেবারে ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিটসোটাকিস বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্কও বাড়াতে চান। অর্থাৎ এথেন্সের লক্ষ্য শুধু ইসরাইল কেন্দ্রিক জোট তৈরি করা নয়; বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা—এমনটাই গ্রিক সরকারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।

আর এখানেই সামনে আসে ‘অ্যাকিলিস’ নামটির আরেকটি অর্থ। গ্রিসের জন্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যদি ক্রমাগত অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নিরাপত্তার মূল্যও বিবেচনা করতে হয়। সামরিক জোট একদিকে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে তৈরি হতে পারে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও পাল্টা জোটের একটি চক্র।

গ্রিস ও তুরস্ক উভয়ই ন্যাটোর সদস্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত হলে সেটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সংকট থাকবে না; ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ তৈরি করবে। ১৯৯৬ সালের কার্দাক সংকটের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছিল। তাই বর্তমান উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তার প্রভাব পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রিস ও তুরস্কের বিরোধের রাজনৈতিক সমাধান এখনো সামরিক সক্ষমতার বাইরে রয়ে গেছে। এজিয়ান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা, সাইপ্রাস এবং দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ নিয়ে মতপার্থক্য কেবল নতুন ক্ষেপণাস্ত্র বা রাডার দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং সামরিক ভারসাম্যের পাশাপাশি সরাসরি সংলাপ, আস্থা তৈরির ব্যবস্থা এবং বাধ্যতামূলক বিরোধ-নিষ্পত্তির কাঠামো প্রয়োজন।

অতএব ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ গ্রিসের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়াতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থা একই সঙ্গে গ্রিস-ইসরাইল কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করবে এবং তুরস্কের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রতিযোগিতাকেও তীব্র করতে পারে। শেষ পর্যন্ত গ্রিসের সামনে আসল প্রশ্ন হতে পারে—আরও শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার গড়া, নাকি এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা, যেখানে তুরস্ক ও গ্রিস পরস্পরকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে না দেখে বিরোধগুলো রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কারণ অস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান করতে পারে না।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ ও এপি নিউজ