ইরান যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার তথ্য নিয়ে আগস্টের শুরু থেকেই মার্কিন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছিল। এসব তথ্য কীভাবে গণমাধ্যমে পৌঁছাল, তা খতিয়ে দেখতে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তদন্তের অংশ হিসেবে প্রায় ৫০ জন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার পলিগ্রাফ পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই তদন্তের তথ্য ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধে অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর চাপের মধ্যে পেন্টাগনের ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গের সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও হোয়াইট হাউসে আলোচনা হয়েছে বলে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। তবে তাকে সরানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং পেন্টাগনও এমন কোনো প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া চলার কথা অস্বীকার করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, পলিগ্রাফ পরীক্ষাগুলো চলতি বছরের আগস্টে নেওয়া হয়। পরীক্ষার আওতায় ছিলেন জয়েন্ট স্টাফের কর্মকর্তা ছাড়াও ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এবং অন্যান্য সামরিক কমান্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের কাছে বিশেষ করে জানতে চাওয়া হয়, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত, যুদ্ধের সক্ষমতা কিংবা অন্যান্য সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য সাংবাদিকদের কাছে দিয়েছেন কি না।
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও সীমিত মজুতের অস্ত্র। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক অস্ত্র দ্রুত ব্যবহৃত হচ্ছে, এমন তথ্য বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন কীভাবে গণমাধ্যমের হাতে পৌঁছাল, সেটিই এখন পেন্টাগনের তদন্তের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমে তথ্য ফাঁস করেছেন, এমন প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ফাঁস-সংক্রান্ত প্রশ্নে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের কেউই পলিগ্রাফ পরীক্ষায় ব্যর্থ হননি বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই পলিগ্রাফ পরীক্ষার আওতায় ছিলেন না বলে একজন জ্যেষ্ঠ পেন্টাগন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা ব্যক্তিগত বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, শ্রেণিবদ্ধ জাতীয় নিরাপত্তা তথ্য ফাঁসকে প্রতিরক্ষা বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং এ ধরনের তথ্য ফাঁসের বিষয়ে তদন্ত করা হয়। শ্রেণিবদ্ধ তথ্য সুরক্ষিত রাখা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কেন এত বড় তদন্ত?
ইরান যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ও সীমিত মজুতের অস্ত্র দ্রুত ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এসব প্রতিবেদনে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি ও অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ বাড়তে পারে, এমন তথ্য উঠে আসে।
এই তথ্য ফাঁসের ঘটনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তদন্তকারীদের মধ্যে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয় যে অত্যন্ত সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তার কাছে থাকা সংবেদনশীল তথ্যের উৎসের সঙ্গে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ থাকতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জুলাই থেকেই পেন্টাগনে লিকবিরোধী অভিযান
অস্ত্রের মজুতসংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের তদন্তটি হঠাৎ শুরু হয়নি। জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগন ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। এর লক্ষ্য ছিল সরকারের সংবেদনশীল তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
হেগসেথের নির্দেশে পেন্টাগনের অফিস অব জেনারেল কাউন্সেলকে তথ্য ফাঁসের তদন্তে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদন্তকারীদের অনুরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত তথ্য সরবরাহের নির্দেশও দেওয়া হয়।
এর আগে পেন্টাগনে অন্য একটি শ্রেণিবদ্ধ ব্রিফিংয়ের তথ্য ফাঁসের ঘটনাতেও হেগসেথ পলিগ্রাফ পরীক্ষার কথা তুলেছিলেন। ফলে এবার প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরীক্ষাকে প্রশাসনের তথ্য-ফাঁস দমনের কঠোর অবস্থানের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পলিগ্রাফ পরীক্ষা কতটা স্বাভাবিক?
শীর্ষ মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের জন্য পলিগ্রাফ পরীক্ষা একদম অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষ করে টপ-সিক্রেট বা বিশেষভাবে সুরক্ষিত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি থাকা কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট সময় পরপর এমন পরীক্ষা হতে পারে।
কিন্তু এবারের পরীক্ষার পরিধি ব্যতিক্রমী। একই তদন্তের অংশ হিসেবে এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মীকে পরীক্ষা করানোকে কর্মকর্তারা বিরল ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এ ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এই পলিগ্রাফ পরীক্ষায় এফবিআই সরাসরি যুক্ত ছিল না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তদন্তকারীরাই পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত পরিচালনা করেছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রতিরক্ষা দপ্তরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের জল্পনা
অস্ত্রের মজুত ও উৎপাদন নিয়ে চাপের মধ্যেই পেন্টাগনের ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গকে সম্ভাব্যভাবে প্রতিস্থাপনের জন্য হোয়াইট হাউস প্রার্থীদের পর্যালোচনা করেছে বলে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
কয়েকটি সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়ে আলোচনা অন্তত জুন থেকেই চলছিল। এমনকি সম্ভাব্য প্রার্থীরা সিনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবেন কি না, তা নিয়েও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। আগস্টের শেষ নাগাদও এই পর্যালোচনা চলছিল বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
তবে ফেইনবার্গকে সরানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। হোয়াইট হাউস এসব বেনামি সূত্রের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পেন্টাগনও ফেইনবার্গকে প্রতিস্থাপনের কোনো প্রক্রিয়া চলার কথা অস্বীকার করেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও জানিয়েছেন, ফেইনবার্গ তার পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছেন এবং তিনি পদ ছাড়ছেন না।
অস্ত্র সংকটের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগসূত্র
ফেইনবার্গের ওপর নজরদারি বাড়ার অন্যতম কারণ ইরান যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া। প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো এবং দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
কিন্তু ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়ছে। নতুন অস্ত্র উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা কত দ্রুত ঘাটতি পূরণ করতে পারবে—এ বিষয়টি এখন ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ।
পেন্টাগনে নেতৃত্বের অস্থিরতা
ফেইনবার্গকে ঘিরে জল্পনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন পেন্টাগনে ইতোমধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের পরিবর্তন হয়েছে। আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেছেন। এর আগে নেভি সেক্রেটারি জন ফেলানসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দায়িত্ব ছেড়েছেন।
ফলে ফেইনবার্গকে ঘিরে নতুন জল্পনা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। একদিকে পেন্টাগন সংবেদনশীল তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁসের উৎস খুঁজতে কর্মকর্তাদের পলিগ্রাফ পরীক্ষা করছে; অন্যদিকে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তাদের কার্যক্রমও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যে পড়ছে।
তবে এখন পর্যন্ত ৫০ কর্মকর্তার মধ্যে কেউ অস্ত্রের মজুতসংক্রান্ত তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস করেছেন, এমন প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। একইভাবে স্টিভ ফেইনবার্গকে পদ থেকে সরানোরও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ফলে পুরো ঘটনাটি এখন পর্যন্ত পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তথ্য-নিরাপত্তা তদন্ত, মার্কিন অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের নেতৃত্ব ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন জল্পনার সমন্বিত চিত্র তুলে ধরছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস; সিবিএস নিউজ; রয়টার্স; দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল; দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট; আল জাজিরা; আনাদোলু এজেন্সি