মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধপরিস্থিতি যত উত্তপ্ত হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে বহুমুখী সংকট ততই বাড়ছে। গত কয়েকদিন থেকে ফের নতুন করে বাজছে যুদ্ধের দামামা। পালটাপালটি একাধিক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নানাভাবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হুমকি দেওয়া অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু এসবে কোনো পাত্তা দিচ্ছে না তেহরান। বরং ইরানের পক্ষ থেকে কড়া বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান প্রতিটি হামলার উপযুক্ত জবাব দেবে। তোপ দাগছে তাদের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র খেইবার, খোররামশাহর, সেজ্জিল, ফাত্তাহ ও খেইবার শেকান। ইরানের হাতে আরও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র থাকার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ অবস্থায় সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতোমধ্যে এই যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম হু-হু করে বাড়ছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশসহ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলো। বাড়বে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ও বেকারত্ব।
এর আগে অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি লঙ্ঘন করে টানা ১৪ দিন হামলার পর গত জুলাইয়ের শেষদিকে ইরানে হামলা বন্ধের আকস্মিক ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারপর এক মাস তিনি ইরানের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেন। তার অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, তারা তেহরানকে নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে যাচ্ছেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তখন প্রচার শুরু করে- সংঘাত অর্থনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে ইরানে আবারও হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল না থাকায় দোদুল্যমান নানা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ট্রাম্প। এতে দেশের ভেতরে তার জনপ্রিয়তা এতটাই কমেছে যে, জন-অনুমোদনের হার মাত্র ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি মার্কিন ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টের সর্বনিম্ন। অন্যদিকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ইরান সফলভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানছে। তাদের আছে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খেইবার ও খোররমশাহর। সেজ্জিলের মতো ক্ষেপণাস্ত্র চলতে প্রয়োজন হয় না তরল জ্বালানির। আছে ফাত্তাহ ও খেইবার শেকান। পাশে আছে রাশিয়া ও চীনের স্যাটেলাইট সহায়তা। এ কারণে নির্ভুল আঘাতে জর্জরিত মার্কিন স্থাপনা, এক সময় যা ছিল কল্পনাতীত। ইরানের হাতে আরও শক্তিশালী কোনো ক্ষেপণাস্ত্র থাকার আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে।
প্রশ্ন উঠছে, ইসরাইলের হয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে কি ট্রাম্প একাই বিপাকে পড়েছেন? মার্কিন হামলার জবাবে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। কার্যত এটা পুরো বিশ্বের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরার ঘটনা। কারণ এতে ওই প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ইরান প্রণালিটি বন্ধ করার পর এর বাইরে ওমান সাগরে আরেকটি অবরোধ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা তারা করেছে ইরানের অনুমোদিত জাহাজ আটকে দিতে।
মাত্র ছয় মাসের যুদ্ধে ধুঁকতে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো নানামুখী সমস্যার আবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হয়েছে। ফলে বেড়েছে পরিবহণ খরচ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে শত ডলার ছুঁইছুঁই। ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে ৯৭ দশমিক ২০ ডলারে, যা আগের দিনের চেয়ে ১ দশমিক ৫৭ ডলার বেশি।
গত মঙ্গলবার রাতে ইরানে মার্কিন হামলার পর জ্বালানি তেলের এ ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। ওই রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কুয়েস্তক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে নিহত বেড়ে বৃহস্পতিবার ১৮ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১০৮ জন নারী ও শিশু। ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যে হামলা চালায়, তাতে মিনাব শহরের একটি স্কুলে ১৬৮ শিক্ষার্থী নিহত হয়। ওই হামলার পর সম্ভবত এটাই কোনো নিরেট বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা।
বৃহস্পতিবার আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আরও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তিনি চাইলে যে কোনো সময় ইরানে হামলা চালাতে পারেন। ইরানও পালটা আঘাতে জর্ডান, কাতার, বাহরাইন ও ইরাকে মার্কিন স্থাপনাকে তছনছ করেছে। হামলার শিকার হয়েছে মার্কিন সেনাদের আবাসিক স্থাপনাও। ইরান বলছে, এতে অনেক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে সেনা হতাহতের খবর বরাবরই গোপন রাখে ওয়াশিংটন। বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলাকে ইরান ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ধুঁকতে থাকা বিশ্বে মড়ার উপর খাঁড়া ঘা হয়েই এসেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধটি। কার্যত এ যুদ্ধের প্রভাব বহন করার সামর্থ্য বিশ্বের নেই। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও জর্ডানের মতো দেশগুলোতে কাজ করে এসব দেশের কর্মীরা নিজ নিজ দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। যুদ্ধের কারণে তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে আরব আমিরাতের মতো বিদেশি পর্যটকের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। এখন যুদ্ধের কারণে সেখানে কেউ সহসা যেতে চান না।
বৈদেশিক মুদ্রা কমে গেলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ থেকে কর্মী যাওয়া কমে গেলে দেশে বেকারত্ব বাড়বে। বাড়বে মূল্যস্ফীতি। ব্যাংকগুলো ঋণে সুদ বাড়াতে বাধ্য হবে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে অনেক দেশের। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি গত বছরের ৩ দশমিক ৩ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ ঘোষণা করেছে প্যারিসভিত্তিক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশগুলোর তালিকায় জাপান, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন-তাইওয়ান, শ্রীলংকা, ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও গ্রিসের নাম রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইরান যুদ্ধের কারণে এসব দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং হচ্ছে।
মূলত বাংলাদেশও এ যুদ্ধের অন্যতম ভূক্তভোগীদের মধ্যে একটি দেশ। যুদ্ধ শুরুর পর গত এপ্রিলের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি সম্ভাব্য ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশের পূর্বাভাস দেয়। সেই সঙ্গে তারা জানায়, অন্তত ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাবেন; দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাড়বে; ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে। এ যুদ্ধ বাংলাদেশ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে তাদের অবশ্যই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
যে ঝুঁকিটি সবচেয়ে বড় : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে বৈশ্বিক শক্তিগুলো বিভাজিত হয়ে পড়েছে। এতে বাড়ছে মেরুকরণ। এর প্রভাবে রয়েছে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিও। চীন, রাশিয়া, ইরান এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে একদিকে দেখা যাচ্ছে। আরেকটি তৃতীয় বলয় হিসাবে আছে ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা। কিন্তু সেখানে ইউক্রেনের পাশেও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জটিল এক সমীকরণের মধ্যে যে কোনো বড় যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে। সম্প্রতি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে এক হয়েছে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তান। এ জোটে আরও কয়েকটি দেশের যোগদানের বিষয়ে আলোচনা চলছে। উত্তেজনা বাড়ছে চীন ও তাইওয়ান নিয়েও। ইরান ও ইউক্রেনে যে যুদ্ধ চলছে, এগুলো বন্ধ না হলে বিশ্ব যে আরও বড় সংকটের দিকে এগোবে-এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন কেবল উন্নয়নশীলরাই নয়, উন্নত দেশগুলোকেও এর মাশুল গুনতে হবে।