জানান, প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো পানি ধেয়ে আসতে দেখেছেন তিনি, যা মুহূর্তের মধ্যে আস্ত একটি বাজার ভাসিয়ে নিয়ে যায়। রাসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং নেপালের এই তিন জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কয়েক মিটার গভীর কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়ে আছে। চোখের সামনে শত শত ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও হাজারো মানুষের স্বপ্ন বিলীন হয়ে গেছে। প্রিয়জন হারানোর শোকে পাথর হয়ে যাওয়া ওই ব্যবসায়ীর মতো শত শত মানুষ এখন কেবল কাদার স্তূপের দিকে তাকিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
ভূমিকম্প নয়, জানা গেল নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ বন্যার মূল কারণ: নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কারণ ভূমিকম্প নয়। পাহাড় থেকে বিশাল বরফখণ্ড ধসে সৃষ্ট এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিধসের ফলেই এই বিপর্যয় হয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এবং নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৫৯ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজারের বেশি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা। প্রাথমিকভাবে নেপাল কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল কোনো ভূমিকম্পের ফলে এই বন্যা সৃষ্টি হয়েছে।
তবে ইউএসজিএস দীর্ঘমেয়াদি সিসমিক তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে, রেকর্ড করা ভূকম্পন মূলত হিমবাহের বিশাল পাথর ও বরফখণ্ড ভেঙে নিচে পড়ার কারণেই তৈরি হয়। নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড়ের ওপর থেকে বরফের বিশাল একটি স্তর ভেঙে পড়ার সময় আশপাশের বিপুল পরিমাণ পাথর ও মাটি নিচে টেনে নিয়ে যায়। এর ফলে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের এক বিধ্বংসী স্রোত তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ গলে যাওয়া, কোনো হিমবাহ হ্রদের হঠাৎ পানি উপচে পড়া কিংবা অতিবৃষ্টির প্রভাব রয়েছে কিনা, তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের শোক, সহায়তার প্রস্তাব
কূটনৈতিক রিপোর্টার জানান, নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে প্রয়োজনীয় যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ঢাকা। প্রয়োজনে উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসা সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন।
বুধবার নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং দেশটির জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে শোকবার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেপালে ভয়াবহ বন্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনায় তিনি গভীরভাবে শোকাহত ও ব্যথিত। প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, এই কঠিন বিপর্যয়ের সময়ে বাংলাদেশের চিন্তা ও প্রার্থনা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দুর্যোগের এই সংকটময় মুহূর্তে নেপালের প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুত রয়েছে। তিনি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এ সময় তিনি নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানান। ফোনালাপে খলিলুর রহমান নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ভয়াবহ ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নেপালের প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বন্ধুপ্রতিম দেশ নেপালের এই দুর্যোগে সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্ধারকাজ এবং মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। ফোনালাপে নেপালে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত হয়েছেন কিনা, সে বিষয়েও জানতে চান খলিলুর রহমান। কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহত হওয়ার অনাকাক্সিক্ষত তথ্য পাওয়া গেলে তা বাংলাদেশকে অবহিত করতে নেপাল সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংহতি ও সহযোগিতার প্রস্তাবের জন্য নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নেপালের কর্তৃপক্ষ এখনো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে। পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের পর নির্দিষ্ট কোনো সহায়তার প্রয়োজন হলে বাংলাদেশকে জানানো হবে।
অন্যদিকে, নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শোক প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। দুর্যোগে নিহতদের স্মরণে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। নীরবতা পালন শেষে নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।