ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়া-ব্রিটেন সম্পর্কের বরফ আরও জমাট বাঁধল। সাত বছর দায়িত্ব পালনের পর লন্ডন ছেড়েছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিন। কিন্তু তার জায়গায় এখনও কাউকে পাঠায়নি মস্কো। ফলে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে, এটি কি শুধুই রাষ্ট্রদূত বদলের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্কের স্তর নামিয়ে আনার ইঙ্গিত?
কেলিন গত জুলাইয়ে ব্রিটেন ছেড়েছেন। তার নাম এখন রাশিয়ার লন্ডন দূতাবাসের ‘জ্যেষ্ঠ ডিপ্লোম্যাটিক স্টাফ’ তালিকায় আর নেই। বর্তমানে দূতাবাসের নেতৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভাসিলি এ সিগানভ। তবে নতুন রাষ্ট্রদূতের নাম ঘোষণা করেনি ক্রেমলিন।
রুশ দূতাবাসের বক্তব্য, কেলিন তার দায়িত্বকালে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার রাশিয়ার প্রতি ’সংঘাতের পথ’ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মস্কো। দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেছেন, কেলিন এমন এক সময়ে ব্রিটেন ছেড়েছেন, যখন ভবিষ্যতে আরও ’গঠনমূলক ও সম্মানজনক সংলাপ’ ফেরার আশা রয়েছে যদি লন্ডন তার নীতি পরিবর্তন করে।
তবে ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির মূল কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের হাতে ব্রিটিশ তৈরি আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর মস্কোর ক্ষোভ আরও বেড়েছে। রুশ দূতাবাস হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, লন্ডনের পদক্ষেপের “পরিণতি” ভুগতে হবে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছে, ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলায় ব্রিটিশ সংস্থার তৈরি ড্রোন ব্যবহার করেছে এমন খবর সত্য। এর মধ্যে বিএই সিস্টেমসের তৈরি ‘নিয়ান’ ড্রোনের নাম সামনে এসেছে। যদিও ব্রিটেনের দাবি, ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তা আন্তর্জাতিক আইনের আওতাতেই রয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও এর আগে সতর্ক করেছিলেন, ব্রিটেন ইউক্রেনকে সহায়তার মাধ্যমে সংঘাত বাড়াচ্ছে। মস্কোর বক্তব্য, পশ্চিমা দেশগুলি ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে। অন্য দিকে লন্ডনের অবস্থান, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করা হচ্ছে।
সম্পর্ক কি নামছে আরও নিচে?
রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নতুন প্রতিনিধি না পাঠানো কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সাধারণত রাষ্ট্রদূতের পদ খালি থাকলে নতুন কাউকে পাঠানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় কোনও উত্তরসূরি না থাকলে তা কার্যত সম্পর্কের স্তর কমিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই তলানিতে। গুপ্তচরবৃত্তি, নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতিক বহিষ্কার–একাধিক ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ব্রিটিশ নিরাপত্তা মহলের আশঙ্কা, রাষ্ট্রদূত না পাঠানোর সিদ্ধান্ত সেই দূরত্বকে আরও স্থায়ী রূপ দিতে পারে।
সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জন ফোরম্যান বলেছেন, রাষ্ট্রদূতের পদ কিছু সময় খালি থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, তাতে রাশিয়া হয়তো স্থায়ী ভাবেই কূটনৈতিক সম্পর্কের স্তর নিচে নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কেলিন ছিলেন ক্রেমলিনের বার্তাবাহক?
আন্দ্রেই কেলিন ২০১৯ সালে লন্ডনে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি ক্রেমলিনের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার বক্তব্য ছিল, রাশিয়া এই যুদ্ধে “হারতে পারে না”।
তিনি এর আগে রাশিয়ার বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির মৃত্যু এবং ২০১৮ সালের স্যালিসবারি বিষপ্রয়োগ কাণ্ড নিয়েও পশ্চিমা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
তবে কেলিনের বিদায়কে ঘিরে শুধু ব্যক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তাই দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, মস্কো বোঝাতে চাইছে, ইউক্রেন ইস্যুতে ব্রিটেনের অবস্থানের মূল্য দিতে হবে।
এদিকে ব্রিটেনও অবস্থান বদলায়নি। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকার জানিয়েছে, ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত থাকবে। লন্ডনের যুক্তি, রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিয়েভকে সহায়তা করা কোনও সংঘাত উসকে দেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিয়ম রক্ষার অংশ।
রাষ্ট্রদূত চলে গেছেন, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। দূতাবাস এখনও খোলা রয়েছে, যোগাযোগের ন্যূনতম পথও রয়েছে। তবে লন্ডনে রুশ রাষ্ট্রদূতের খালি চেয়ার এখন একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও তার অভিঘাত এখন সরাসরি পৌঁছে গেছে কূটনীতির টেবিলে। আর কেলিনের বিদায় সেই উত্তেজনার নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।